আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক বছর

সালতামামি ২০২৫

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সাল বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় ও যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে স্থিতি লাভ করেছে। বছরের প্রথম দিন থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে বিচারিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয়েছে জুলাই গণহত্যার মূল কারিগরদের দণ্ড প্রদানের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের চাকা ঘুরে গত এক বছরে দেশের মানুষ দেখেছে নিজের গড়া আদালতেই সাবেক সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সাজার রায়। দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ২০২৫ সালে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল।

১. শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ও ঐতিহাসিক রায়

২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যা মামলায় গত ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকারই এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল, যেখানে একযুগের ব্যবধানে তার নিজেরই বিচার সম্পন্ন হলো। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

২. জুলাই গণহত্যা ও দ্রুততম বিচার

শেখ হাসিনার মামলার বিচার প্রক্রিয়া ৩৯৭ দিনে সম্পন্ন হয়েছে। এটি ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম বিচার। মোট ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ২৮ কার্যদিবসের শুনানির পর এই রায় আসে। এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে মামলাও এ বছর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

৩. গুম ও নির্যাতনের বিচার শুরু

আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের বিচার ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে গতি পেয়েছে। র‌্যাবের ‘টিএফআই’ ও ‘জেআইসি’ সেলে বিরোধীদের ওপর চালানো নৃশংসতার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১৫ জন সেনাকর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। গুমের এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার সাক্ষ্যগ্রহণ আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি শুরু হওয়ার কথা।

৪. ক্ষমতাধরদের কাঠগড়ায় হাজিরা

এ বছর ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় নিয়মিত হাজিরা দিয়েছেন একসময়ের প্রতাপশালী মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে উসকানি ও ষড়যন্ত্রের বিচার চলছে। এমনকি বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানকেও আদালত অবমাননার অভিযোগে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হয়েছে।

৫. চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা অন্য মামলাগুলো

বছর শেষেও ট্রাইব্যুনালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : আবু সাঈদ হত্যা মামলা (রংপুর); চানখাঁরপুল গণহত্যা (৬ জন নিহতের মামলার রায় ২০ জানুয়ারি); আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনা; হাসানুল হক ইনু ও মাহবুবউল আলম হানিফসহ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা।

৬. ক্ষতিপূরণ ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত

এ বছর ট্রাইব্যুনাল কেবল দণ্ড দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং দণ্ডিতদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার এক যুগান্তকারী নির্দেশ দিয়েছেন।

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রমাণ করেছে যে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও অপরাধের বিচার থেকে নিস্তার নেই। ট্রাইব্যুনালের এই তৎপরতা দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।