রাজাকার মন্তব্যে দেশজুড়ে ক্ষোভ

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition
রাজাকার মন্তব্যে  দেশজুড়ে ক্ষোভ
রাজাকার মন্তব্যে দেশজুড়ে ক্ষোভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়ার দিন। টানা কয়েকদিন ধরে চলা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির মধ্যেই এদিন আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা পায়। সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ চললেও দিনের শেষভাগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মন্তব্য আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হাজারো শিক্ষার্থী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস, যা পরবর্তী কয়েক দিনের সংঘাত ও আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

১৪ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে তারা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। আন্দোলনের সমন্বয়করা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট।

দুপুরের পর আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা আরো তীব্র হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটা সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত প্রকাশ হতে থাকে। আন্দোলনকারীরা জানান, তাদের দাবি রাজনৈতিক নয়; এটি চাকরিতে বৈষম্য দূর করে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার আন্দোলন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও সংলাপের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের আহ্বান জানান।

দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে বিকেলে। গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুঁতিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুঁতিরা চাকরি পাবে? এই মন্তব্য মুহূর্তেই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ বক্তব্যকে নিজেদের প্রতি অপমানজনক হিসেবে দেখেন। সে সময় তাদের অভিযোগ ছিল, যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলনকে ‘রাজাকার’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করে তাদের হেয় করা হয়েছে।

সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের জটলা বাড়তে থাকে। রাত বাড়ার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে থাকে। বিদ্যুৎহীন অন্ধকারের মধ্যেই বিজয় একাত্তর হল থেকে প্রথম উচ্চারিত হয়, তুমি কে, আমি কে রাজাকার, রাজাকার স্লোগান। পরে মুহূর্তের মধ্যে সেই স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব আবাসিক হলে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ‘রাজাকার’ শব্দটি ভয় ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, সেদিন তারা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেই সেই শব্দকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে গ্রহণ করেন। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে হল থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিল একের পর এক ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই স্লোগান পৌঁছে যায় নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলোতেও। রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীরা থালা-বাসন বাজিয়ে প্রতিবাদের সাথে সংহতি জানান এবং পরে হল থেকে বেরিয়ে মিছিলে যোগ দেন।

নারী শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতদিন আন্দোলনের সামনের সারিতে মূলত পুরুষ শিক্ষার্থীদের দেখা গেলেও, ১৪ জুলাই থেকে নারীরা দৃশ্যমান নেতৃত্ব ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাদের সাহসী অবস্থান অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করে এবং আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পরিবর্তন আসে।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা রাতেই মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আমি রাজাকার’ হ্যাশট্যাগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বহু শিক্ষার্থী নিজেদের প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেন এবং আন্দোলনের সমর্থনে বিভিন্ন বার্তা প্রকাশ করেন। ফলে আন্দোলন শুধু রাজপথে নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নতুন গতি লাভ করে।

সারা দিনের ঘটনাপ্রবাহে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্দোলনের বিস্তৃতি। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন হলেও এদিন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ আরো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অনেক অভিভাবকও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনটি এদিন একটি নির্দিষ্ট দাবি থেকে বৃহত্তর জন-আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ওইদিন শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সমন্বয়করা পরদিন আরো বড় কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন। অন্য দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরবর্তীকালে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৪ জুলাই ছিল সেদিন, যেদিন কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলন আবেগ, প্রতীক ও প্রতিরোধের নতুন ভাষা খুঁজে পায়। প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা যে প্রতীকী স্লোগান গ্রহণ করেন, সেটিই পরবর্তী দিনগুলোতে আন্দোলনের অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে। ১৫ জুলাই থেকে সঙ্ঘাত আরো তীব্র হয় এবং পরবর্তী কয়েক দিনে দেশজুড়ে সহিংস পরিস্থিতির জন্ম দেয়।