ঈদের আগেই বগুড়া ও দিনাজপুরে ‘ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন

৫০ লাখের জন্য ব্যয় হবে ১২৫০ কোটি টাকা

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

ঈদের আগেই প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের দু’টি উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এই দুই উপজেলার একটি হচ্ছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা এবং অন্যটি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা। সব কিছু ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি উপস্থিত থেকে এই কার্ড বিতরণ উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। এটি ছিল তার একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য উপজেলায় এ প্রকল্পটি চালু হবে। মোট ৫০ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কার্ডের মালিকানা থাকবে পরিবারের মহিলাদের ওপর। কার্ড প্রতি পরিবারকে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দেয়া হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের পরিবর্তে পণ্যসামগ্রীও দেয়া হতে পারে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের এক হাজার ২৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, গতকাল রোববার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ফ্যামিলি কার্ড চালু করার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। সভায় অর্থ বিভাগসহ মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ কমিটির সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বলা হয়েছে, এই দুই উপজেলায় ভাতাভোগীদের খানা (হাউজ হোল্ড) প্রাথমিক যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সমস্যা হলো-এরা কিছু পূর্ববর্তী সরকারের সময় চিহ্নিত। এদের তালিকা মাঠে পাঠিয়ে উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি দিয়ে ভেরিভাই করে ফাইনাল করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে খ্বু সহজেই ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড দেয়া যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্ভাব্য বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে বলা হয়েছে

এক. ফ্যামিলি কার্ড অন্তর্ভুক্তির যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।

দুই. পাইলটিং পর্যায়ে অর্থ বিভাগের সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত এমআইএস-এ উপকারভোগীর তথ্য এন্ট্রি করা যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, বর্ণিত এমআইএস ব্যবহার করে ইতঃপূর্বে করোনা মহামারী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সরাসরি ইএফটি পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। ওই এমআইসে মাত্র চারটি তথ্য এন্ট্রি দিতে হবে- এনআইডি, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, ইউনিয়নের নাম।

তিন. অর্থ বিভাগের সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম ব্যবহার করে আবেদনকারীর পরিচয় (এনআইডি) যাচাইসহ তার মোবাইল নম্বরটি এনআইডি দ্বারা রেজিস্টার্ড কিনা তা যাচাই করা যাবে। এ ছাড়া, ওই মোবাইল নম্বরে কোন এমএফএস অ্যাকাউন্ট রয়েছে কি না তাও যাচাই করা যাবে।

চার. দ্বৈধতা পরিহারের জন্য সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেমে এনআইডি, মোবাইল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দিয়ে যাচাই করা হবে। উল্লেখ্য যে, সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেমে সরকারের প্রধান প্রধান সব ক্যাশ বেইজড সিস্টেমের প্রায় ৩.৩ কোটি উপকারভোগীর তথ্যসহ নন-ক্যাশ বেইজড প্রোগ্রাম যেমন ভালনারেবল ওম্যান বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচির ১০.৪০ লাখ ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ৫৫ লাখ উপকারভোগীসহ চার কোটিরও বেশি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া, টিসিবির ফ্যামিল কার্ড সিস্টেমের সাথে ইন্টিগ্রেশনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সভায় জানানো হয়, এসব যাচাই বাছাই করে আপাতত বগুড়ার গাবতলী ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড চালু করার প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ইতোমধ্যে আটটি উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান ভাতাভোগীদের খানা মাঠ পর্যায়ে পুনঃ/ প্রাথমিক যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত করতে সাত দিন সময়ের প্রয়োজন হবে। এরপর নীতিমালা প্রণয়ন-অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট কোডে অর্থ বরাদ্দ করা হবে। বর্তমান এমআইএসের মাধ্যমে মাঠ থেকে পে-রোল আনা হবে। এরপর ফ্যামিলি কার্ড বিতরণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এখন এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে আরো ১০ দিনের প্রয়োজন হবে। তাই ২০ রমজানের আগেই এই কার্ড বিতরণকাজ শুরু করা যেতে পারে বলে সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, সরকারি চাকুরেদের পেনশনসহ যাবতীয় ভাতা ‘আইবাস++’ এর মাধ্যমে প্রদান করা হয়ে থাকে। আগামী ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ এই পদ্ধতিতে দেয়া হবে। কারণ এর মাধ্যমে দেয়া হলে ডুপ্লিকেশন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কারণ আইবাসের মাধ্যমে ৯টি পদ্ধতিতে উপকারভোগী পরিচিতি পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইরে মাধ্যমে তিন দিনের মধ্যে ৫০ লাখ মানুষের তথ্য যাচাই করতে পারি। এতে কেউ একাধিক ভাতা নিয়ে থাকলে সহজেই ধরা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, আইবাস++ হচ্ছে (সমন্বিত বাজেট ও অ্যাকাউন্টেং সিসেটেম) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়িত একটি ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যার, যা বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, হিসাবরক্ষণ, পেনশন ও বেতনসহ সরকারের সব আর্থিক লেনদেন রিয়েল-টাইমে পরিচালনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দ্রুত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

প্রসঙ্গ, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী ওয়াদা রক্ষায় সারা দেশে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারই অংশ হিসেবে দেশব্যাপী এ কর্মসূচি চালু হতে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি পরিবারকে মাসে ২৫০০ টাকা করে দেয়া হলে সরকারের প্রতি বছর অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা ব্যয় হবে। ভবিষ্যতে এই কর্মসূচির সম্প্রসারণও হতে পারে। তবে সরকারের দেয়া বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির সুবিধাভোগীরা এ সুযোগ পাবেন না।