কাওসার আজম
রবি মৌসুমের পিক সময় শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বেসরকারি পর্যায়ে নন-ইউরিয়া সার আমদানিতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। দরপত্র আহ্বানের পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব মূল্যায়ন, দরনির্ধারণ এবং আমদানিকারকদের সম্মতি নেয়ার কাজ শেষ হলেও এখনো কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। ফলে আমদানিকারকরা ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না। এতে সময়মতো সার দেশে পৌঁছানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ডিএপি সার নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যাদেশ ও আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করা না গেলে আগামী অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া রবি মৌসুমের পিক সময়ে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এর মধ্যে বেসরকারি নন-ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন এবারই প্রথম সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হচ্ছে। আগে এ ধরনের আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন কৃষি মন্ত্রণালয় পর্যায়েই দেয়া হতো। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনের স্তর বাড়ায় প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরো বেড়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট বেসরকারিভাবে দুই লাখ মেট্রিক টন টিএসপি, পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি এবং দুই লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৮ আগস্টের পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দর প্রস্তাব মূল্যায়নের কাজ শুরু হয়। পরে সরাসরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে মন্ত্রণালয় এমওপির জন্য ২ সেপ্টেম্বর, টিএসপির জন্য ৩ সেপ্টেম্বর এবং ডিএপির জন্য ৬ সেপ্টেম্বর নির্দিষ্ট দর প্রস্তাব করে আমদানিকারকদের সম্মতি চায়। আমদানিকারকরাও তাতে সম্মতি দেন। এরপরও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদন ও কার্যাদেশ দেয়া হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট সাড়ে ৯ লাখ মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সারের মধ্যে গত সপ্তাহে মাত্র ৩০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। বাকি প্রায় পুরো পরিমাণ সারই এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কার্যাদেশ না পাওয়ায় আমদানিকারকরা এলসি খুলে আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে সার আমদানি করে দেশে এনে সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে সাধারণত ৮০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। এ কারণে প্রচলিত নিয়মে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে বেসরকারি নন-ইউরিয়া সার আমদানির দরপত্র আহ্বান এবং জুনের মধ্যেই কার্যাদেশ দেয়ার চেষ্টা করা হতো। এতে আমদানিকারকরা সময়মতো এলসি খুলে সার দেশে আনতে পারতেন এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তা সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হতো।
কিন্তু গত দুই মৌসুমে এই সময়সূচি পিছিয়ে আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এবারো ৩ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করার পর মূল্যায়ন, দর প্রস্তাব ও আমদানিকারকদের সম্মতি নিতে নিতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি চলে এসেছে। অথচ এখনো কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। ফলে ৮০-৯০ দিনের আমদানি সময় বিবেচনায় রবি মৌসুমের শুরুতেই পর্যাপ্ত সার দেশে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে ডিএপি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রবি মৌসুমে ডিএপি সারের চাহিদা ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। অথচ বেসরকারি পর্যায়ে এবার পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি আমদানির প্রক্রিয়াই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আমদানিতে আরো বিলম্ব হলে মৌসুমের মাঝপথে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর সাথে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও পরিবহন ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সার পরিবহনে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি প্রক্রিয়াও যদি বিলম্বিত হয়, তাহলে সময়মতো সার দেশে আনা আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।



