সাইফুল মাহমুদ ময়মনসিংহ অফিস
শিক্ষা, শিল্প ও পাহাড়ের পাদদেশে ব্রহ্মপুত্র বিধৌত ময়মনসিংহে বইছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। এবারের নির্বাচনে জেলার নির্বাচনের বৈচিত্র্যময় চিত্র দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে ১১টি আসনের মধ্যে আটটিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, দু’টিতে দলটির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। মূলত আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলই এখন ময়মনসিংহের ভোটের ফলাফল নির্ধারণের নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নবীন ও নারী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে এবারের নির্বাচনে।
এই লড়াইয়ে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শক্ত অবস্থানে দলটিরই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বিশেষ করে আটটি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সাথে নিজ দলের বিদ্রোহীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক যে দিকে ঝুঁকবে, সেই প্রার্থীর বিজয়ই নিশ্চিত। তবে কিছু কিছু আসনে আঞ্চলিকতার টানও প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে পারে।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) : আসনে ছয়জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তবে তার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। এখানে আওয়ামী লীগ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোট ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচনী সহিংসতায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর একজন সমর্থক নিহত হওয়ার ঘটনাতে সহানুভূতি পাচ্ছেন তিনি। তবে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে বিএনপি প্রার্থীর পাল্লা ভারী হচ্ছে। সব মিলিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাঠে এখন কিছুটা হলেও এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী।
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) : সাতজন প্রার্থীর এই আসনে লড়াই হচ্ছে বিএনপির মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং দলটির বহিষ্কৃত সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ারের মধ্যে। এখানে আঞ্চলিক প্রভাব এবং নতুন ভোটারদের টানার লড়াই চলছে। তবে এগিয়ে আছেন বিএনপি প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) : বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসাইনের প্রধান ও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আহমেদ তায়েবুর রহমান হিরণ। এখানে পাঁচজন প্রার্থীর লড়াইয়ে বিএনপি প্রার্থীর অবস্থা ভালো হচ্ছে।
ময়মনসিংহ-৪ (সদর) : নয়জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির সহ-সংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দের সরাসরি লড়াই হবে জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির মাওলানা কামরুল আহসান এমরুলের সাথে। তবে এগিয়ে আছেন ওয়াহাব আকন্দ। দুই-একদিনের মধ্যে ভোটের হেরফের হলে জামায়াত প্রার্থীর ভিন্ন ইঙ্গিত রয়েছে।
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) : পাঁচজন প্রার্থীর এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই জাকির হোসেন বাবলু। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। এই আসনে লড়াই জমে উঠলেও নিরাপদে আছে বিএনপি।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) : পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আখতারুল আলম। অন্য দিকে, জামায়াত প্রার্থী কামরুল হাসান মিলন। তবে এখানে বিএনপি ও জামায়াত উভয়ের বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। এর মধ্যে বিএনপি প্রার্থীর চাচী বিএনপির বিদ্রোহী আখতার সুলতানাও বেশ শক্তিশালী। ফলে চতুর্মুখী লড়াইয়ে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট ভাগাভাগি হলেও সব এলাকায় ভোট থাকায় এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী মিলন।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) : এখানে ছয় প্রার্থীর মধ্যে দু’জনই বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী। তবুও লড়াইয়ে এগিয়ে বিএনপি প্রার্থী ডা: মাহবুবুর রহমান লিটন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আসাদুজ্জামান সোহেল। তবে ভোটের দৌড়ে বিদ্রোহীদের গতি কিছুটা পাল্টে বিএনপির অবস্থা ভালো হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ও নতুন ভোটাররাই ফলাফল নির্ধারণ করবে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) : সবচেয়ে কম; চারজন প্রার্থীর এই আসনে অনেকটা নির্ভার বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। এখানে জামায়াতের কোনো প্রার্থী নেই। তবে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির সাবেক নেতা শাহ নুরুল কবীর। তিনিই বিএনপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) : এই আসনের লড়াই এখন পারিবারিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। বিএনপির প্রার্থী ইয়াসির খান চৌধুরী। আর বিদ্রোহী প্রার্থী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তার চাচী হাসিনা খান চৌধুরী। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা চৌধুরী এখানে এগিয়ে আছেন। তার সাথে ত্রিমুখী লড়াই করবেন বিডিপির আনোয়ারুল ইসলাম ও বিএনপির ইয়াসির খান।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) : বিএনপির নবীন প্রার্থী আকতারুজ্জামান বাচ্চুর মুখোমুখি হয়েছেন প্রবীণ বিদ্রোহী প্রার্থী এ বি সিদ্দিকুর রহমান। নয় প্রার্থীর মধ্যে আঞ্চলিকতার প্রভাবে বিএনপির বিদ্রোহী এ বি সিদ্দিকুর রহমান এখনো এগিয়ে। বিএনপি প্রার্থীর সাথেই তার মূল লড়াই হবে।
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) : শিল্পাঞ্চল ভালুকায় পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে বিএনপির ফকরউদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এবং বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোরশেদ আলমের। তবে এখন পর্যন্ত মাঠের তথ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দু’জনই। অবশ্য শেষ মুহূর্তে ভাগ্য পরিবর্তনে আওয়ামী ভোটার ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, ময়মনসিংহের ১১টি আসনে মোট ভোটার ৪৪ লাখ ৮৩ হাজার ৯১ জন। যার মধ্যে পুরুষ ২২ লাখ ৪০ হাজার ৫৮৬ এবং নারী ভোটার ২২ লাখ ২ হাজার ৪৭০ জন। ১ হাজার ৩৬০টি কেন্দ্রের ৮ হাজার ৭৪২টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে ৫৮৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।



