হরমুজ নিয়ে মার্কিন আশাবাদ ইরানের প্রত্যাখ্যান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যেকোনো পরিস্থিতিতেই কৌশলগত হরমুজ প্রণালী আর পূর্বের অবস্থায় ফিরছে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ইরান। মার্কিন চাপ ও হুমকির মুখে নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু না হটার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতিবিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র হাসান ঘাশঘাভি এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। বহিরাগত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত কোনো পথ তেহরান গ্রহণ করবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, ওমানের সাথে সমঝোতা হলেই এই নৌপথ দ্রুত খুলে যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করতে থাকলে কোনো চুক্তিই কার্যকর হবে না। মার্কিন প্রশাসন থেকে আসা একতরফা তথ্য বাস্তবে রূপ নেয়ার সুযোগ নেই বলে দেশটির গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালী শিগগিরই চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই নৌপথ উন্মুক্ত না করা হলে ইরানে কঠোর হামলা চালানো হতে পারে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। আলজাজিরা জানায়,

ইরানের সাথে আলোচনা চলছে এবং হরমুজ প্রণালী ‘খুব দ্রুত’ খুলে দেয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব না হলে তেহরানকে তীব্র সামরিক হামলার মুখোমুখি হতে হবে বলেও তিনি কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান যে প্রণালীটি শিগগিরই উন্মুক্ত করা হবে, অন্যথায় সেখানে অত্যন্ত মারাত্মক আঘাত হানা হবে এবং তার পরই তা খুলে যাবে। তিনি দাবি করেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়া সত্ত্বেও ইরানি কর্মকর্তাদের বিনীত অনুরোধে তিনি সংলাপে বসতে রাজি হয়েছেন।

ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেয়া হবে না উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান যে তারা যদি ফের আলোচনা থেকে সরে আসে তবে তাদের কঠোর জবাব দেয়া হবে। মঙ্গলবার দিনভর ইতিবাচক বৈঠক হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান যে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে। এই সমঝোতা সফল হলে প্রণালী উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ২ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংবাদ মাধ্যম এক্সিওসের এক খবরে বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ওমান চুক্তি বাস্তবায়নে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বুধবারের মধ্যেই যৌথ ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান যে ওয়াশিংটন এবং তেহরান এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছায়নি, তবে খুব দ্রুতই সমঝোতা হবে বলে তারা আশাবাদী। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্টে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে রুবিও বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা আশা করছি, শিগগিরই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে।

তিনি জানান, কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করছে। তবে আরো বেশি জাহাজ যাতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে, সে বিষয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। রুবিও বলেন, বর্তমানেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন হচ্ছে। অর্থাৎ প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ নয়। এই সময়ে তিনি হরমুজের পাশাপাশি বাবুল-মান্দেব প্রণালীর কথাও উল্লেখ করেন। ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বন্দরের সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি দেয়ার পর এই নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাবুল-মান্দেব প্রণালী ইয়েমেন ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত। এটি এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। রুবিও আরো বলেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তি এখন বেশি আলোচনায় থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো।

অন্য দিকে, হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় একটি খসড়া রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও ইরানের সাথে খুব দ্রুত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয়ে আলোচনা হলেও নৌপথ চালুর বিষয়ে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে তেহরান। মঙ্গলবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের সাথে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং মঙ্গলবার অথবা বুধবারের মধ্যেই একটি সমঝোতা হতে পারে।

তবে ইরানের সাথে চলমান আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরাইলকে কোনো তথ্য বা আপডেট দিচ্ছে না বলে জানিয়েছে দেশটির চ্যানেল ১২। ফলে তেলআবিব কর্তৃপক্ষকে এসব আলোচনার বেশির ভাগ তথ্য পরোক্ষভাবে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

খবরে উল্লেখ করা হয় যে ইরান সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে ইসরাইলের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরাইলি কর্মকর্তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি সম্পর্কে তাদের ক্রমবর্ধমান সংশয় প্রকাশ করেছেন। উক্ত কর্মকর্তা জানান যে ‘ট্রাম্পের অধীনে শান্তি ও যুদ্ধের মধ্যকার দূরত্ব কেবল কিবোর্ডের টি, আর এবং ইউ অক্ষরের মধ্যবর্তী দূরত্বের মতো।

ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে গভীর অসন্তোষ ও সংশয় প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা যেকোনো মূল্যে তেহরানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছেন। ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর এক খবরে এই তথ্য উঠে এসেছে।

খবরে এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে তেলেআবিবের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। তিনি মন্তব্য করেন, ট্রাম্পের নীতিতে যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যকার ব্যবধান হলো কিবোর্ডের টি, আর এবং ইউ অক্ষরের দূরত্বের মতো। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের অভ্যাসের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।

চ্যানেল ১২ জানায়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীসংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে ওয়াশিংটন সরাসরি ইসরাইলকে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে পরোক্ষ মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিতে হচ্ছে তেলআবিবকে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আড়ালে ইসরাইলি কর্মকর্তারা এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে উপহাস করছেন।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নৌযান চলাচলের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে দ্রুতই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অন্য দিকে পাকিস্তানের সরকারি সূত্রের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা একটি চুক্তিপত্র তৈরি করছেন। এ নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগীদের সাথে আলোচনা জোরদার করেছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই সঙ্ঘাতের সূচনা হয়। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে এপ্রিলে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সামরিক সঙ্ঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে গত মাসে সেই চুক্তি ভেঙে গেলে দুই সপ্তাহ ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চলে। পরবর্তীতে সঙ্ঘাত নিরসনে আলোচনার খবরের মধ্যে ট্রাম্প হঠাৎ করে বোমাবর্ষণ বন্ধের নির্দেশ দেন।