সরকারি প্রকল্পে কর্মকর্তাদের দক্ষতাও মূল্যায়ন করুন : হোসেন জিল্লুর

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পারফর্মম্যান্স মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেখা যায় কোনো প্রকল্পে নিয়োজিতরা দুর্নীতি করলেন না, আবার কাজও করলেন না, ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে গেল, সেক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় ও দীর্ঘসূত্রতা বেড়ে যাবে। তাই, প্রকল্পে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্টাদের কাজের মূল্যায়নেরও দরকার রয়েছে। একই সাথে তিনি সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত ‘ফ্যামিলি কাড’ধারীরা যাতে তাদের কাছে দেয়া সরকারি অর্থের কিছু অংশ পানি, স্যানিটেশন, হাইজিন কাজে ব্যবহার করেন তা দেখার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন।

গতকাল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিচার্স সেন্টার (পিপিআরসি) ও ওয়াটার এইড আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। ধানমন্ডিতে অবস্থিত পিপিআরসি অফিসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সর্বশেষ বাজেট-পরবর্তী ওয়াশ বাজেট-ট্র্যাকিং বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে ‘পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ)’ খাতে প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দ এবং এসডিজি ৬, ১০, ১৩ ও ১৭ এবং জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ওয়াশ বরাদ্দে পুনরুদ্ধার হয়েছে, তবে সমতার ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে গত তিন অর্থবছর ধরে ওয়াশ এডিপি বরাদ্দে যে নিম্নগতি দেখা গিয়েছিল, তা থেমেছে। ওয়াশ বরাদ্দ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকা বরাদ্দের পর ধারাবাহিক পতনের প্রেক্ষাপটে এটি একটি ইতিবাচক পুনরুদ্ধার।

তবে নীতি সংক্ষিপ্তে সতর্ক করা হয়েছে যে, বরাদ্দ বৃদ্ধি পূর্বের সর্বোচ্চ মাত্রার নিচেই রয়ে গেছে এবং একে এককভাবে ওয়াশ অর্থায়নের গভীরতর কাঠামোগত উদ্বেগের সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। অন্যান্য খাতের তুলনায় এ বৃদ্ধি এখনো অপ্রতুল। জাতীয় বাজেট যেখানে ৯.৩৮ শতাংশ এবং মোট এডিপি ৩.১৬ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে ওয়াশের আপেক্ষিক অংশ বেড়েছে মাত্র ০.১৩ শতাংশ। মূল প্রশ্ন হলো- এই বাড়তি বরাদ্দ সর্বোচ্চ সেবা ঘাটতি, জলবায়ু ঝুঁকি ও বঞ্চনার মুখে থাকা জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে কি না।

ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নিরাপদ পানি ও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন থেকে এখনো প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত। তাই চ্যালেঞ্জ এখন নীতিগত উপকরণের অভাব নয়; বরং সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে মানুষের জন্য বাস্তব সেবায় রূপান্তর করা,’

শহরকেন্দ্রিক প্রবণতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রীভবন

বাজেট-ট্র্যাকিং বিশ্লেষণে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মধ্যে, পাশাপাশি ওয়াসা ও গ্রামীণ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, বরাদ্দ বৈষম্যের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে বড় ধরনের সেবা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও শহরাঞ্চল মোট ওয়াশ এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৭২ শতাংশ পাচ্ছে।

চারটি পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) সম্মিলিত বরাদ্দ তিন হাজার ৫১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ছয় হাজার ৬৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। ঢাকা ওয়াসা একাই পেয়েছে পাঁচ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মোট ওয়াশ এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৩৬.৭৮ শতাংশ। এই বরাদ্দের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে চলমান বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সাথে যুক্ত, যা বাস্তবায়ন দক্ষতা ও সুযোগ ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে আনে। অন্যদিকে বরিশাল, ঢাকা দক্ষিণ, সিলেট ও চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ কমেছে, যা আন্তঃনগর বৈষম্যকেও প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশের প্রায় ৪১.৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো নিরাপদ খাবার পানির সুবিধা থেকে এবং ৬০.৭ শতাংশ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন থেকে বঞ্চিত (বিবিএস-ইউনিসেফ এমআইসিএস ২০২৫)। এই চলমান সেবা ঘাটতির প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরসহ (ডিপিএইচই) গ্রামীণ অগ্রভাগের প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন হাজার ৪২৭.৮৫ কোটি টাকা থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দুই হাজার ৪০৮.১৯ কোটি টাকায় নেমে আসা বড় উদ্বেগের বিষয়; কারণ গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং জলবায়ু-সহনশীল ওয়াশ অবকাঠামোতে ডিপিএইচই-এর ভূমিকা কেন্দ্রীয়।

উপ-খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি, তবে হাইজিন এখনো অগ্রাধিকারের বাইরে নীতি সংক্ষিপ্তে ওয়াশের কয়েকটি উপখাতে উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি উল্লেখ করা হয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন ও ঝুঁকি হ্রাসে অর্থায়ন বেড়ে তিন হাজার ১৪৩ কোটি টাকা হয়েছে। ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট (এফএসএম) খাতে বরাদ্দ এক হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৯০৪ কোটি টাকা হয়েছে; আর সক্ষমতা বৃদ্ধির বরাদ্দ ৯১৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এসব অগ্রগতি দীর্ঘদিনের কিছু নীতিগত উদ্বেগের আংশিক জবাব দেয়।

একই সময়ে, হাইজিন এখনো ওয়াশের একটি পৃথক উপখাত হিসেবে যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। বিশেষত কোভিড-পরবর্তী সময়ে হাইজিন অগ্রাধিকার দুর্বল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে নীতি সংক্ষিপ্তে একটি পৃথক ও ট্র্যাকযোগ্য বাজেট লাইনের মাধ্যমে হাইজিনকে আবার ওয়াশ অর্থায়ন এজেন্ডায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।