প্রাণ ফিরছে পার্কি সমুদ্রসৈকত ও কর্ণফুলী টানেল অতিথিশালার

Printed Edition
প্রাণ ফিরছে পার্কি সমুদ্রসৈকত ও  কর্ণফুলী টানেল অতিথিশালার
প্রাণ ফিরছে পার্কি সমুদ্রসৈকত ও কর্ণফুলী টানেল অতিথিশালার

এসএম রহমান দক্ষিণ চট্টগ্রাম

প্রাণ ফিরছে বিপুল সম্ভাবনাময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের পার্কি সমুদ্রসৈকত ও বহুল আলোচিত কর্ণফুলী টানেল অতিথিশালার। বাপাউবোর ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চলমান বাঁশখালী-আনোয়ারা সাগর উপকূল ও নদীর তীর সুরক্ষায় টেকসই প্রতিরক্ষা প্রকল্পকাজের সাথে সঙ্গতি রেখে চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূল সুরক্ষায় ৫৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সেটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রাণ ফিরবে পার্কি সমুদ্রসৈকতের। এ ছাড়া ৪৫০ কোটি টাকায় নির্মিত কর্ণফুলী টানেল অতিথিশালাকে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পড়ে থাকা এই সাত তারকা অতিথিশালাকেও ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ইতোমধ্যে আনোয়ারা উপজেলার পার্কি সমুদ্র সৈকত ঘিরে পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পর্যটন কমপ্লেক্সে পরিণত করার লক্ষ্যে ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্পকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পর্যটন করপোরেশন ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে এর কাজ শুরু করে। ১৩ দশমিক ৩৬ একর জমিতে দর্শানার্থীদের জন্য ১৭টি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এরমধ্যে ১৪টি কটেজ, ৪টি ডাবল ডুপ্লেক্স কটেজ এবং ১০টি সিঙ্গেল কটেজ। চারতলা বিশিষ্ট একটি মাল্টিপারপাস ভবন। এ ছাড়াও থাকছে একটি লেক, ঝুলন্ত ব্রিজ, দুইটি পিকনিক শেড, কুকিং শেড, খেলার মাঠ। আরো থাকবে দুইটি দোকান, একটি রেস্টুরেন্ট, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় থাকবে দুইটি বার, একটি ২৫০ আসনের কনভেনশন হলও রয়েছে। চলতি জুলাইয়ের শেষ দিকে শেষ হচ্ছে কমপ্লেক্স নির্মাণ।

সেই সাথে ওই পর্যটন কমপ্লেক্সের সুপেয় পানির সমস্যাও সমাধান হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াসার ভাণ্ডালজুড়ি পানি শোধনাগার থেকে প্রায় ৪০ হাজার লিটার প্রতিদিনের চাহিদা মোতাবেক পানি সরবরাহ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। গতকাল বিকেলে ভাণ্ডালজুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্পের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর প্রকৌশলী মাহবুবুবুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, পানি সরবরাহের জন্য চার কিলোমিটার সরবরাহ লাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু একটি পাম্প-হাউজ নির্মাণ কাজ বাকি রয়েছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণœ রেখে পার্কি সৈকতকে আরো আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাপাউবো ৫৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে টেকসই প্রতিরক্ষার প্রকল্প প্রণয়ন করেছে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফূলী নদীর ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে পার্কি সৈকতসহ পুরো আনোয়ারা সুরক্ষিত হবে বলে নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ।

জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত প্রকল্পে রয়েছে ৩ দশমিক ৪৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ, ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, একটি স্লুইস গেট নির্মাণ, দুই দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ। এ ছাড়া প্রকল্পে রয়েছে ১০ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার খাল খনন কাজ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৩০ দশমিক ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, বন্যা-ঘূর্ণিঝড় থেকে রায়পুর ইউনিয়ন সুরক্ষা, উপকূলীয় বাঁধ প্রতিরক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও পার্কি সমুদ্র সৈকতকে আরো দৃষ্টিনন্দন করার লক্ষ্যেই মূলত নতুনভাবে চলমান কাজের সাথে সঙ্গতি রেখেই এ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্র সৈকত ছাড়াও উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষা ও সবুজ বেষ্টনীতে পরিণত করা হবে। তিনি গতকাল বলেন, প্রকল্পের ডিপিপি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হবে। এ দিকে ২০২৪ সালের ২৭ মে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলা সুরক্ষায় ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে আনোয়ারা সুরক্ষায় ৩৫১ কোটি টাকার কাজ বর্তমানে সন্তোষজনকভাবে চলছে। পর্যটন করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) যুগ্মসচিব মো: মাজেদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, চলতি মাসেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অন্য দিকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী (সাত তারকা মানের) অতিথিশালা ২৯ বছরের জন্য লিজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বিলাসবহুল অতিথিশালা নির্মাণের তিন বছর পার হলেও তা চালু হয়নি। ওই অতিথিশালা নির্মাণের পর থেকে খালি পড়ে আছে। ওই অতিথিশালা নির্মাণে বিপুল অঙ্কে টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল র্নিমাণের ব্যয়ও বেড়েছে। এতে সব মিলে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ব্যয় দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। অপর দিকে টানেল খুলে দেয়ার পর থেকে প্রতিদিন প্রায় এর আয়ের চেয়ে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমানে প্রতিদিন টানেল সচল রাখতে গড়ে ২৩ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে আর আয় হচ্ছে গড়ে সাড়ে ১১ লাখ টাকা। এর আগে বিগত সরকারের সময়ে টানেলে প্রতিদিন গড়ে ব্যয় হয়েছে ৩৭ লাখ টাকার উপরে। এ বিষয় নিয়ে নয়া দিগন্তে একাধিকবার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতিথিশালায় রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের আধুনিক সুসজ্জিত একটি বাংলো। এ ছাড়া রয়েছে ছয়টি কক্ষ। সামনেই রয়েছে সুইমিংপুল। অতিথিশালা ছাড়াও নির্মাণ করা হয়েছে আরো ৩০টি রেস্টহাউজ। টানেল নির্মাণ প্রকল্পে যে জায়গায় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে, সেটাকে বলা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’। প্রকল্পের শুরুতে ‘সার্ভিস এরিয়া’ ছিল না। মাঝপথে তা যুক্ত করে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে নানা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এটি গড়ে তোলা হয়েছে আনোয়ারা এলাকায় টানেলের দক্ষিণ প্রান্তে পারকি খালের পাশে। সেখান থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে পার্কি সমুদ্রসৈকত। সার্ভিস এরিয়াজুড়ে বাংলো ও রেস্টহাউজ ছাড়া রয়েছে টানেলের একটি রেপ্লিকা, সম্মেলনকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন। আরো রয়েছে একটি জাদুঘর। এসব স্থাপনায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা (এসি) বসানো হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার।

অতিথিশালা সার্ভিস এরিয়া ইজারা দেয়ার বিষয় জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে বলেন, অতিথিশালা নির্মাণের পর থেকে এখন পর্যন্ত চালু করা হয়নি। এটি চালুর জন্য জনবলও নেই। সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৩ জুলাই দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে।