কর্তৃত্ববাদ তৈরিতে এক-এগারো

জিয়া পরিবারকে বন্দী, নির্যাতন ও কোণঠাসা করা : প্রতিবেশী দেশের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করে হাসিনার ক্ষমতায়ন

Printed Edition
কর্তৃত্ববাদ তৈরিতে এক-এগারো
কর্তৃত্ববাদ তৈরিতে এক-এগারো

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়ান-ইলেভেন (১১ জানুয়ারি ২০০৭) শুধু একটি ক্ষমতার পালাবদল ছিল না- এটি ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর গভীরে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টিকারী মুহূর্ত, যা পরবর্তীতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভিত তৈরি করে দেয়। এ সময়ে জিয়া পরিবারকে বন্দী, নির্যাতন ও কোণঠাসা করা হয়। প্রতিবেশী দেশের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায়িত করে মাইনাস ওয়ান ফর্মুলার বাস্তবায়ন করা হয়।

কয়েকটি স্তরে এসব কাজ করা হয় এবং তাতে ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সবার একই ভূমিকাও ছিল না। তবে এই অভ্যুত্থানের মূল ব্যক্তি ছিলেন রক্ষীবাহিনী থেকে আত্মীকৃত হওয়া সেনাকর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় মেজর র‌্যাঙ্কের ওপরে ওঠার কথা না থাকলেও নিজের আত্মীয়তার সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীর শীর্ষ স্তর পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে গেছেন। আর যাদের কল্যাণে এ পর্যায়ে পৌঁছেছেন তাদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারা থেকে বিদায়ের জন্য সম্ভব সব কিছু তিনি করেছেন। আর এ জন্য শেখ হাসিনার সরকারের কাছে পুরস্কৃতও হয়েছেন জেনারেল মাসুদ উদ্দিন।

জেনারেল মাসুদ ওয়ান-ইলেভেন ঘটাতে সে সময়কার সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমদ উৎসাহিত করলেও পরে তার সাথে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। আর এ সময় প্রতিবেশী দেশ সেনাপ্রধানের সাথে যোগসূত্র তৈরি ও সমঝোতায় পৌঁছে বলে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বই থেকে জানা যায়। এ সময় ছয় দিনের বহুলালোচিত ভারত সফরে জেনারেল মঈন ইউ আহমদকে ছয়টি ঘোড়া উপহার দেয়া হয়। এটি পরে গোলামীর উপহার হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। এ সময় সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান ও সদ্য গ্রেফতার হওয়া মামুদ খালেদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জিয়া পরিবারকে মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ পরিকল্পনায়ও তার মুখ্য অবদান রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

গণতান্ত্রিক ধারার ভাঙন ও বিরাজনীতিকরণ

ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে একটি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে এই হস্তক্ষেপকে ‘অস্থায়ী সমাধান’ হিসেবে বৈধতা দেয়া হয়। কিন্তু এর ফলে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হয় যে- গণতন্ত্র ব্যর্থ হলেই ‘অগণতান্ত্রিক শক্তি’ হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এই ধারণা ভবিষ্যতে যেকোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক সরকারের জন্য যুক্তি হিসেবে কাজ করে।

ওয়ান-ইলেভেন সরকার ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’ চালিয়ে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার বা কোণঠাসা করে। এর ফলে- রাজনীতির স্বাভাবিক নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে; নতুন বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না এবং রাজনীতি হয়ে পড়ে ‘ভীত ও নিয়ন্ত্রিত’।

এই শূন্যতা পরবর্তীতে একটি শক্তিশালী একদলীয়/একক নেতৃত্বের উত্থানের পথ তৈরি করে।

রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকরণ : প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন

ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে- প্রশাসন ‘নিরপেক্ষ’ থেকে ‘ক্ষমতানির্ভর’ হয়ে যায়; নিরাপত্তা বাহিনী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের অভ্যাস গড়ে তোলে এবং আইনের শাসনের বদলে ‘নিয়ন্ত্রিত শাসন’ প্রতিষ্ঠা পায়।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’ ও ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’র নামে- বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ; মিডিয়া ট্রায়াল ও মানবাধিকার লঙ্ঘন- এসবকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। এর ফলে পরে এগুলো নিয়মিত রাষ্ট্রীয় কৌশলে পরিণত হয়।

এই সময় মিডিয়ার একটি অংশকে ব্যবহার করে ‘সংস্কার’ ও ‘শুদ্ধি অভিযান’কে জনপ্রিয় করা হয়। বিরোধী মতকে দুর্বল করা হয় এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত বয়ান শক্তিশালী হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে তথ্যনিয়ন্ত্রণ ও প্রোপাগান্ডা রাজনীতির ভিত্তি তৈরি হয়।

‘দুই নেত্রীকে বাদ’ দেয়ার প্রকল্প

ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ‘মাইনাস টু’ (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সরানো)। এই প্রকল্প ব্যর্থ হলেও এর প্রভাব ছিল- রাজনীতিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে ফেলা এবং দলীয় গণতন্ত্র আরো দুর্বল হওয়া। এর পরবর্তীতে ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতা আরো শক্তিশালী হয়।

ওয়ান-ইলেভেন সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়- ‘স্থিতিশীলতার জন্য কঠোর শাসন দরকার’। এই মনস্তত্ত্বই পরে ভিন্নমত দমনে নীরবতা; কঠোর আইন মেনে নেয়া এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষয়ে যাওয়াকে সামাজিকভাবে সহনীয় করে তোলে।

ওয়ান-ইলেভেন সরাসরি কোনো ফ্যাসিবাদী সরকার তৈরি করেনি, কিন্তু এটি-গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা নষ্ট করেছে; রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের উপযোগী করেছে এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার জন্য সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে ।

তাই একে অনেক বিশ্লেষক ‘বাংলাদেশে আধুনিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের ব্লুপ্রিন্ট’ হিসেবে দেখেন।

জিয়ার পরিবারকে রাজনীতি থেকে বিদায়ের চেষ্টা

ওয়ান-ইলেভেন (২০০৭) পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু দলীয় রাজনীতিকে ‘সংস্কার’ করতে চায়নি বরং বিশেষভাবে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা চালায়। এই প্রচেষ্টা ছিল বহুস্তরীয়- আইন, প্রশাসন, মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক চাপ-সবকিছু মিলিয়ে।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সক্রিয়ভাবে একাধিক মামলা করে। বেগম খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলে- তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আইনি জটিলতায় তাদের রাজনৈতিকভাবে অচল করে দেয়া। এসব অভিযোগের কোনোটিই আইনানুগভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

গ্রেফতার ও কারাবন্দী করা : মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা

২০০৭ সালে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তারেক রহমানকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে মুক্তিলাভ করে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য যান তারেক রহমান। একবারে সুস্থ অবস্থায় আরাফাত গ্রেফতারের পর অনেকটা পঙ্গু অবস্থায় মুক্তিলাভ করেন। তিনি স্বাভাবিক জীবন কার্যত আর ফিরে পাননি। শেষ পর্যন্ত অকালে মৃত্যুবরণ করেন।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে জিয়া পরিবারকে কার্যত রাজনীতির বাইরে রাখা হয়। এর ফলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় শূন্যতা তৈরি হয়।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আলোচিত পরিকল্পনা ছিল বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা-এই দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়া। অভ্যুত্থানের নেতাদের সাথে ভারতীয় প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সমঝোতার পর এটিকে কার্যত মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা বানিয়ে বিএনপিকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। প্রণব মুখার্জি তার বইয়ে এই সমঝোতার কথা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।

এই পরিকল্পনায় জিয়া পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়; রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চাপ দেয়া হয় এবং দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির অপচেষ্টা চালানো হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এটি ব্যর্থ হয়, কিন্তু প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।

পঙ্গু করে তারেক রহমানকে নির্বাসনে ঠেলে দেয়া

২০০৮ সালে পঙ্গু অবস্থায় চিকিৎসার অজুহাতে তারেক রহমানকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। এরপর তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। বাস্তবে এটি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক নির্বাসন। এতে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়।

ওয়ান-ইলেভেন আমলে রাষ্ট্র-সমর্থিত বয়ানের মাধ্যমে- তারেক রহমানকে ‘দুর্নীতির প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যার কোনো গ্রহযোগ্য ভিত্তি ছিল না। রাজনীতির বাইরে থাকা কোকোর বিরুদ্ধেও নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়। একজন সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাত বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। তাকে অসুস্থ অবস্থায় বছরের পর বছর নির্জন কারাবাসে রাখা হয়। এর মাধ্যমে জনমনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমানোর চেষ্টা করা হয়।

দল ভাঙার চেষ্টা : সংস্কারপন্থী বিএনপি

সরকার নানাভাবে বিএনপির ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করে- ‘সংস্কারপন্থী’ নেতাদের সামনে আনা হয়; খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং বিকল্প বিএনপি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পরিবার ও ব্যক্তিত্বনির্ভর নেতৃত্ব ভেঙে দেয়া।

তৎকালীন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহল ‘সুশাসন’ ও ‘দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার’কে সমর্থন করছিল। এই অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সরকার তাদের পদক্ষেপকে বৈধতা দেয় এবং নেতৃবৃন্দকে রাজনীতি থেকে সরানোর প্রক্রিয়াকে ‘সংস্কার’ হিসেবে তুলে ধরা হয় ।

ওয়ান-ইলেভেন সরকার সরাসরি বলপ্রয়োগ করে খালেদা জিয়ার পরিবারকে রাজনীতি থেকে সরাতে পারেনি, কিন্তু তারা-আইনি মামলা, গ্রেফতার, নির্বাসন, মিডিয়া প্রচারণা, দলীয় বিভাজন- এই সব কৌশল একসাথে প্রয়োগ করে একটি ‘রাজনৈতিক ডি-ফ্যাক্টো এক্সিট’ তৈরি করতে চেয়েছিল।

এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বিএনপির নেতৃত্বকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশে ব্যক্তিত্বনির্ভর রাজনীতির সঙ্কট আরো গভীর হয়। বিএনপি ১৭ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকে।