নিজস্ব প্রতিবেদক
বাগেরহাটে কোস্টগার্ড পরিচয়ে তুলে নেয়া মিরাজ শেখকে ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে তার পরিবার ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। এতে বক্তব্য রাখেন মিরাজের মা তাসলিমা বেগম, স্ত্রী মুক্ত ফাতিমা, বোন লিজা ইসলাম, মানবাধিকার কর্মী নুরখান লিটন প্রমুখ।
বোন লিজা ইসলাম বলেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাগেরহাটের জয়মনি ঠোড়ার কোচঘাট হারবাড়িয়া স্টেশন থেকে কোস্টগার্ড পরিচয়ে দুইজন সাদা পোশাকধারী স্থানীয় মিজান মাঝির একটি নৌকায় করে জয়মনি এলাকায় আসেন। এরপর তারা মিরাজকে মান্নানের জালবোটে তুলে হারবাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যান। এই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত মিরাজের কোনো সন্ধ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকবার কোস্টগার্ড সদস্যদের সাথে যোগাযাগ করা হয়েছে। তারা মিরাজ শেখকে আটক করার কথা স্বীকার করে বলেছিল, কোনো অপরাধ না করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত তাকে ফিরে পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা যেতে পারে। তবে আটকের পর তাকে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে আদালতে পাঠাতে হবে বিচারের জন্য।
তিনি বলেন, ১০ এপ্রিল মিরাজ শেখ নিখোঁজ হয়েছেন বলা হলেও নিখোঁজ কথাটি বলা ঠিক হবে কি না- তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ এলাকার অনেকে দেখেছেন, সাদা পোশাকধারী কোস্টগার্ডের কয়েকজন সদস্য তাকে নিয়ে গেছেন। কোস্টগার্ডের কাছে মিরাজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটক করে আদালতে পাঠানো উচিত ছিল। কোস্টগার্ড প্রথম থেকে মিরাজ তাদের হেফাজতে থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও কিছুদিন পর থেকে বলছে, নেই এবং তারা মিরাজকে নেয়নি। মিরাজ শেখকে সুস্থ দেহে সুস্থভাবে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে এটাই প্রত্যাশা। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচার করতে হবে।
এ ব্যাপারে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে কোনো সময় আটক, হেফাজতে গ্রহণ বা গুম করা হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়। অনুসন্ধানে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মিরাজ শেখের পরিবারকে ব্যবহার করে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে সরকার ও একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর বিরুদ্ধে গুজব ছড়াচ্ছে।
অভিযোগে উল্লেখিত ১০ এপ্রিল জয়মনির ঘোল এলাকায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়নি। মিরাজ শেখ নিখোঁজ হওয়ার ১৩ দিন পর করা সাধারণ ডায়েরিতেও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বা অন্য কোনো ব্যক্তি/সংস্থার বিরুদ্ধে আটক, অপহরণ বা গুমের কোনো অভিযোগ উল্লেখ করা হয়নি। পরে বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাস্থল, পোশাক ও ঘটনার বিবরণে একাধিক অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়, যা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে যৌক্তিক প্রশ্নের সৃষ্টি করে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মিরাজ শেখ সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনদস্যু চক্রের সাথে সম্পৃক্ত এবং বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর লজিস্টিক সহায়তা, মাদকসেবন ও মাদক কারবারিতে জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বনদস্যু চক্রের মুক্তিপণ ও চাঁদার প্রায় ছয় লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সাথে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ছাড়া তার বাবা আগে একটি বনদস্যু বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরে আত্মসমর্পণ করেন। পিসিপিআর যাচাইয়ে মিরাজ শেখের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা চলমান রয়েছে, যার মধ্যে দুইটি মামলায় তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি।



