ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাপরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠন পরে গণভোট এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী জোটের অবস্থান বর্তমানে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা বলছে, গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাই গণভোট মানতে সরকারকে বাধ্য করা হবে। অন্য দিকে সরকারি দল বলছে, সংবিধান মেনেই সংসদে আলোচনার ভিত্তিতে সব কিছু করা হবে। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, দলটির চূড়ান্ত ভাবনা হলো গণভোটের রায়কে পুরোপুরি অস্বীকার না করে সেটিকে একটি ‘জনমত’ হিসেবে গণ্য করা। একইভাবে তার বাস্তবায়ন যেন দলের ভবিষ্যৎ নির্বাহী ক্ষমতাকে সঙ্কুচিত না করে এমনভাবে করণীয় ঠিক করা। তাই বিএনপি চায় গণভোটের অধ্যাদেশকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করা। জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে তাদের নিজস্ব ৩১ দফার আলোকে ‘পুনরায় ব্যাখ্যা’ করে সংসদে উত্থাপন করা।
প্রসঙ্গত, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আর সংবিধান সংস্কারে ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন করে তাতে ভোটারদের সামনে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ -তে ভোট দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। নির্বাচনে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল নিয়ে বিএনপির এই ‘কৌশলগত দূরত্ব’ বাংলাদেশে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। এক দিকে সংসদ ও রাজপথের বিরোধীরা গণভোটের পূর্ণ বাস্তবায়ন চাইছে, অন্য দিকে বিএনপি সাংবিধানিক দোহাই দিয়ে সংসদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলছে। বোদ্ধারা বলছেন, এই বিভাজনের সমাধানই নির্ধারণ করবে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন সংবিধানের ভবিষ্যৎ চেহারা।
সূত্র মতে, ক্ষমতাসীন বিএনপি গণভোটের ফলাফলকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছে। দলটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি যে আদেশের মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন, তার সাংবিধানিক বৈধতা নেই। বিএনপি মনে করে সংবিধানের যেকোনো বড় পরিবর্তন বা সংস্কার কেবল নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তারা সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে বড় কোনো সংস্কারের পরিবর্তে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সাংবিধানিক উপায়ে সংস্কারের পক্ষপাতী। দলটির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণায় প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমর্থন জানালেও, বর্তমানে বিএনপি বলছে, তারা ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতি রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ কিন্তু এটি বাস্তবায়নের জন্য আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। তাই বিএনপি এই মুহূর্তে গণভোটকে তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাইছে না। তারা মনে করছে গণভোট আয়োজনের দায়িত্ব মূলত সরকারের এবং এটি নিয়ে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো বা জনমত গঠনের দায় তাদের নয়। দলটি গণভোটের ফলাফলকে সরাসরি গ্রহণ না করে বরং এটিকে অসাংবিধানিক হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে সংসদের মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান বা সংস্কারের দাবির কথা বলছে।
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, তার একটি বড় পরীক্ষা ছিল গত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট। একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আয়োজিত সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে এখন সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক। গণভোট নিয়ে বিএনপির বর্তমান অবস্থান এবং দলটির ‘চূড়ান্ত ভাবনা’ মূলত সাংবিধানিক বৈধতা এবং দলীয় সংস্কার এজেন্ডার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। বিএনপির বর্তমান অবস্থানের মূল ভিত্তি হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি যে আদেশের মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন, তার কোনো স্থায়ী সাংবিধানিক বৈধতা নেই। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গণভোট অধ্যাদেশটি বর্তমান সংসদে অনুমোদনের জন্য না তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি দল বিএনপি। ফলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার পথে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত ‘জুলাই সনদ’-এর কিছু প্রস্তাবনার সাথে বিএনপির নিজস্ব ‘৩১ দফা’ সংস্কার রূপরেখার পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি বিশেষ জুলাই সনদে মেয়াদের যে কড়াকড়ি প্রস্তাব করা হয়েছে, বিএনপি সেখানে নিজস্ব ব্যাখ্যা বা পরিবর্তন আনতে আগ্রহী। সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর (বিশেষ করে জামায়াত ও এনসিপি) মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। বিএনপির এই অবস্থানকে ‘জনগণের রায়ের অবমাননা’ হিসেবে দেখছে বিরোধী দলগুলো। জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অবিলম্বে গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বা সংস্কার সভার অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধীদের মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে দেশ আবার সঙ্কটে পড়তে পারে। অন্য দিকে সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও সেটি কেবল একটি ‘অবৈধ’ আদেশের ভিত্তিতে নয় বরং প্রথাগত সংসদীয় প্রক্রিয়াতেই সেটি সম্ভব হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, বিএনপি জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে। সরকার গঠনের পর বিএনপি এখন মনে করছে, দু’টি নির্বাচনের একটির মূল্য নেই। সেজন্য তারা সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। কিন্তু এটা সংশোধনের অযোগ্য। সংস্কার মানে সংশোধনী না। সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় সঙ্কটের জন্ম দেবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে বিরোধীরা তাদের দাবিতে অনঢ় থেকে আন্দোলনে নেমেছে। এটি চলমান থাকলে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আবারো ঘোলাটে হতে বাধ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোটে মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার মাধ্যমে। গণভোট সংবিধানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখন যা হচ্ছে সেটি হলো জনরায় উপেক্ষা করা। এর ফলে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে।
এ দিকে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণভোট ও এর বৈধতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি সম্প্রতি বলেন, গণভোটের রায়কে চূড়ান্ত সম্মান দিতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংসদে এসে সব কিছু করতে হবে। তিনি মনে করেন, নির্বাচিত সংসদই আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের একমাত্র সার্বভৌম স্থান এবং গণভোট কখনোই সংসদের বিকল্প হতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিচালিত গণভোট এবং সাধারণ নির্বাচন এক বিষয় নয়। এ নিয়ে আদালতে রিট আবেদন বিচারাধীন থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর নির্ভর করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ গণভোটের রায়কে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার না করলেও এর আইনি ভিত্তি ও প্রয়োগকে পুরোপুরি সংসদীয় প্রক্রিয়ার অধীনে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।



