মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীতে ঝুঁকি বৃদ্ধি, শিপিং খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘেœর কারণে দেশের বাণিজ্য প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, বাড়তি ভাড়া, ডেলিভারি বিলম্ব ও কনটেইনার জটিলতায় রফতানিকারক ও আমদানিকারকরা নতুন চ্যালেঞ্জে পড়ছেন, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরানকে ঘিরে চলমান সঙ্ঘাত এবং ইসরাইলসহ পশ্চিমা শক্তির উত্তেজনার জেরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ঢেউ এসে লাগছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব না থাকলেও জ্বালানি বাজার, শিপিং খরচ, রফতানি বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহে এর বহুমুখী অভিঘাত দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরো গভীর হতে পারে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে সঙ্ঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক তেলের বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তা সরাসরি প্রভাব ফেলে। এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং পরিবহন খরচও বেড়ে যায়। সরকার ভর্তুকি বাড়াবে নাকি জ্বালানির দাম সমন্বয় করবে- এই দ্বৈত চাপে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শিপিং খাতেও অস্থিরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ ও ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে, এতে প্রতি কনটেইনারে কয়েক শ’ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রফতানিকারক ও আমদানিকারকরা বাড়তি খরচের মুখে পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় অনেক জাহাজকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে। সুয়েজ খাল বা লোহিত সাগরের রুট অনিরাপদ হলে জাহাজগুলোকে উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন সময় ১০ থেকে ১৫ দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে।
এমন পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে, বিশেষ করে তৈরী পোশাক শিল্পে। সময়মতো পণ্য সরবরাহে বিঘœ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা কমে গেলে রফতানি আদেশ কমে যেতে পারে, যা শিল্প খাত ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানিতেও স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে, কারণ অনেক কনটেইনার বিভিন্ন বন্দরে আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, এভাবে শিপিং খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে যেখানে মূল্য সংবেদনশীলতা বেশি, সেখানে পণ্যের দাম বাড়লে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, আমদানির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কাঁচামাল, সার ও খাদ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে শিল্পখাতে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিতে পারেন এবং দেশীয় উদ্যোক্তারাও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে শিল্প প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বিকল্প শিপিং রুট ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে। কারণ বর্তমান বিশ্বে কোনো সঙ্ঘাতই আর সীমাবদ্ধ থাকে না। ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার প্রতিধ্বনি শোনা যায় ঢাকার বাজারে, নিত্যপণ্যের দামে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।



