সংসদ প্রতিবেদক
- জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও মসজিদ-মাদরাসায়
- রাজনীতি বন্ধ করার দাবি বিএনপি এমপির
ভারতের সাথে আবারো সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন সরকারি দল বিএনপির এক সংসদ সদস্য। এ ছাড়া আরেক এমপি জামায়াতের রাজনীতি বন্ধ এবং বিএনপির অন্য সংসদ সদস্য মসজিদ মাদরাসায় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১২তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব দাবি জানান সংসদ সদস্যরা।
স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হতে পারে, ভারতের সাথে না : স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হতে পারে কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সাথে সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বগুড়া-৫ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য জি এম সিরাজ। ভারতের সাথে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে জি এম সিরাজ বলেন, আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হতে পারে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের প্রতিবেশী, এই প্রতিবেশীর সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না। প্রতিবেশীকে আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারি না। না ভারত পারবে, না বাংলাদেশ পারবে।
তিনি আরো বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে আমি একটু সময় নেবো। সেটা হলো যে আমরা সবাই চাই ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনকভাবে আমাদের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখি। কারণ আমি বিশ্বাস করি যে ভারত আমাদের প্রতিবেশী। আমরা চাই দুই বন্ধুতে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী যেন না হয়।
বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রসঙ্গে বিএনপির এমপি বলেন, আমরা দেখলাম- দেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার আসলেন। এসে বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্ব নিয়ে তিনি কাব্যিক ভাষায় কথা বলেছেন। ত্রিবেদী বললেন, ‘আমরা একই আকাশ, একই বাতাসের নিচে আছি। আমাদের বন্ধুত্ব প্রয়োজন।’ কিন্তু আমরা কি দেখলাম? আমরা দেখলাম বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়াতে বিতর্কের ঝড়।
ভারতের পুশইন প্রসঙ্গে জি এম সিরাজ বলেন, আজকে ‘পুশইন’ ভারতের ভাষায় ‘পুশব্যাক’ হচ্ছে। এটা বন্ধ হতে হবে। আমরা বলতে চাই আসুন, মানুষের হৃদয় জয় করুন। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের সাথে ভারতের মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করি। আমরা চাই ভারত বিরোধিতা অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিতা এগুলো না হোক। আমরা কি চাই? আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান করতে চাই। সেই ক্ষেত্রে আমার সবিনয় অনুরোধ ভারতের বর্তমান সরকারের প্রতি, আপনারা দয়া করে ‘পুশইন’ বন্ধ করুন। এ সময় তিনি সীমান্তের দুই পাশে মাদকের কারখানা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ চাইলেন বিএনপির এমপি : বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নাম উল্লেখ না করে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ চাইলেন ঝালকাঠি-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। তিনি বলেন, ‘এই দলটি ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। যে দলটি বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল। আমি মহান সংসদে দাবি করব, তারা বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না, তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মতো নিষিদ্ধ করা হোক।’
বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আরো বলেন, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন নামে পরে ইসলাম থাকলেই ইসলাম হয় না। যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করেন, গত নির্বাচনে ভোটের বিনিময়ে মানুষকে বেহশত দিয়েছেন। আমরা দেখেছি, বিড়ির সুখ টানের মধ্য দিয়েও তারা বলেছিল সব পাপ মওকুফ হওয়া যাবে। এইভাবে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করছে, এই দলটি ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। যে দলটি বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল। আমি মহান সংসদে দাবি করব, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না, তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মতো নিষিদ্ধ করা হোক।
মসজিদ-মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ করার দাবি বিএনপি এমপির : দেশের মসজিদ-মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ করার দাবি তুলেছেন কুষ্টিয়া-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। তিনি বলেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর, মসজিদে মানুষ নামাজ পড়বে, মসজিদে কুরআন শরিফ পড়বে, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে রাজনীতি করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করব আইন পাস করার জন্য, যাতে কোনো মসজিদ মাদরাসায় রাজনৈতিক মিটিং করা যাবে না। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আমরা যেমন প্রকাশ্যে ফুটবল মাঠে বা হাইস্কুলে বা কোনো হলরুমে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলরা কর্মিসভা করি, জনসভা করে মিটিং করি, তাদেরকেও সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তারা মসজিদে মিটিং করতে পারবে না। আমার সাথে সবাই একমত কি না জানি না।
গরিব মারার বাজেট-মাহবুব আলম : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সম্পূর্ণ ‘অবাস্তব ও বাস্তবায়ন অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী। তিনি বলেছেন, এই বাজেটে সম্পদের সুষম বণ্টন হয়নি, বরং বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নকে এই বাজেটে চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে। এই বাজেট গরিব মারার বাজেট।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির কথা স্বীকার করেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য। এত সুন্দর বাস্তবধর্মী একটি বিষয় চিহ্নিত করার পরও কিভাবে এই বাজেটে দুর্নীতি বন্ধ হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ৩০০ আসনে সম্পদের সুষম বণ্টন হবে সে ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা বা কৌশল দেয়া হয়নি।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে। গত চার মাসের বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি দলের সদস্যদের জন্য যে বাজেট দেয়া হয়েছে বিরোধী দলের সদস্যদের তা দেয়া হয়নি। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বগুড়ার শিবগঞ্জে ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, কিন্তু গাজীপুরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার চেয়ে ৯০ শতাংশ বেশি। ১ ও ২ নম্বর আসনের মধ্যে যদি বরাদ্দের পার্থক্য ৯০ ভাগ হয়, তবে আমরা বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা কোথায় কোন বাজেট পাবো?’
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘বৈষম্যের দলিল’ আখ্যা দিয়ে মাহবুব আলম বলেন, ‘এই বাজেটে উত্তরবঙ্গকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হয়েছে। বহুল কাক্সিক্ষত তিস্তা প্রজেক্ট, কুড়িগ্রাম ইপিজেড এবং কুড়িগ্রামে একটি মেডিক্যাল কলেজের কথা বলা হলেও বাজেটে এর কোনোটির জন্যই বরাদ্দ নেই। উত্তরবঙ্গের কৃষির জন্যও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়নি। আমার নির্বাচনী এলাকার ৭১ ভাগ রাস্তাই এখনো কাঁচা, এগুলো পাকা হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা এই বাজেটে নেই।’
গাইবান্ধার শিবির নেতা হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবি : গাইবান্ধায় শিবির নেতা সাইফুল্লাহ হত্যার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। জাতীয় সংসদে ফ্লোর নিয়ে তিনি বলেন, গাইবান্ধায় একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যুবদল-ছাত্রদলের নেতারা ছাত্রশিবিরের ইউনিয়ন সভাপতি সাইফুল্লাহকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। রফিকুল ইসলাম খান বলেন, খুনি যে দলেরই হোক তাকে গ্রেফতার করতে হবে। খুনি যে দলেরই হোক না কেন, সে খুনিই। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বাজেট বিতর্কে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন : জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। এ সময় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদও সংসদে মন্ত্রীদের আরো বেশি উপস্থিতি দেখতে চান বলে মন্তব্য করেন। সোমবার স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করছি বাজেট অধিবেশনের সময় আমাদের অধিকাংশ মন্ত্রী থাকেন না। আমরা আসলে এত নোট করে নিয়ে আসি। আমাদের সরকারি দল, বিভিন্ন দল, সবাই বক্তব্য দেন।’ সাইফুল আলম বলেন, ‘এইখানে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তারপরে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অনেক মন্ত্রী নাই। মন্ত্রীদের চেয়ার সব খালি। এ ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা চাচ্ছি মাননীয় স্পিকার।’ জবাবে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরো উপস্থিতি দেখতে চাই। শোকর করেন যে অর্থমন্ত্রী অন্তত আছেন এখানে। কিন্তু অন্যান্য মন্ত্রীদেরও অনুরোধ জানাবেন সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে। বাজেট সেশন গুরুত্বপূর্ণ সেশন। তারা থাকলে আমরা বাধিত হবো।’
বাজেট আলোচনায় আরো অংশ নেন, ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, ফজলুর রহমান সাঈদী, নুসরাত তাবাসসুম, হেলেন জেরিন খান, বিথিকা বিনতে হুসাইন, কামরুজ্জামান রতন, ইকরামুল কবির ভূঁইয়া, জসিম উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মাহবুবুর রহমান বেলাল, মাধবী মারমা, সুলতান মাহমুদ বাবু, আমিরুল ইসলাম খান, আফজাল হোসেন প্রমুখ।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার প্যানেল সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
কেরামত আলী (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), জাহাঙ্গীর আলম মিয়া (মাদারীপুর), সংরক্ষিত আসনের ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী, আব্দুল বারি সরকার (রাজশাহী-২), মাহবুবা হাকিম (সংরক্ষিত), লুৎফর রহমান কাজল (কক্সবাজার), আব্দুল্লাহ আল আমিন (নারায়ণগঞ্জ-৪), সেলিনা সুলতানা (সংরক্ষিত), সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা (মাদারীপুর-১) মুজিবুর রহমান (গাজীপুর-১)।



