নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
গুম ও নির্যাতনের শিকার সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান দাবি করেছেন, তাকে গুম করার পর তার সেনাবাহিনী সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র (বিএ নম্বর সংক্রান্ত রেকর্ড) ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরা চলাকালীন আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন।
বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে দ্বিতীয় দিনের মতো হাসিনুরের জেরা অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। জেরার একপর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকীর আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষীর বিএ নম্বর জানতে চান। জবাবে হাসিনুর রহমান বলেন, আমার বিএ নম্বর ২৬১১। আমি দশম বিএমএ লং কোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত। কোর্ট মার্শাল রায়ের পর আমার বিএমএ নম্বর বাংলাদেশ আর্মির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিএমএইচসহ ইত্যাদিতে সাসপেন্ড কি না জানি না। তবে এই নম্বর সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র এখন আর সেনাসদরে নেই, তা ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আদালত এই তথ্যের উৎস জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি শুনেছি, তবে কার কাছে শুনেছি তা নির্দিষ্ট করে এই মুহূর্তে মনে নেই।’
এরপর তার ঠিকানা প্রসঙ্গে জানতে চান দুলু। তিনি বলেন, আমার বর্তমান ঠিকানায় ২০২২ সালের জুন মাস থেকে বসবাস করছি। তাই মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার বিষয়ে লিখিত কোনো সমন বা নোটিশ পাইনি। তবে মৌখিকভাবে সময়-তারিখসহ সাক্ষীর জন্য হাজির হতে বলেছেন প্রসিকিউটর উদয় তাসমির।
এ সময় আইনজীবী বলেন, আপনি প্রসিকিউশনের শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান সাক্ষী। এরপর হাসিনুরকে প্রশ্ন করা হয়, প্রথম দফায় গুমের পর কত তারিখে আপনাকে অফিসার্স সেলে রাখা হয়েছিল। প্রতুত্তরে তিনি বলেন, প্রথম দফায় গুমের পর আমাকে যে তারিখে অফিসার্স সেলে আটক রাখা হয়, সেই তারিখ মনে নেই। ওই সময় আমাকে ৪৩ দিন গুম রাখা হয়।
এরপর তার পদোন্নতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় হাসিনুর বলেন, আমি ক্রমান্বয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদ থেকে লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি পাই। মেজর হিসেবে আমি মিলিটারি পুলিশে পদায়িত হই। লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকাকালীন বিডিআরের দু’টি রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। র্যাব-৫ ও ৭-এর অধিনায়ক ছিলাম।
দ্বিতীয় দফায় গুমের পর ডিজিএফআইয়ের সদর দফতর বা ভবনে গিয়েছিলেন কি না; আইনজীবীর এমন প্রশ্নে এই সেনাকর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত আমি ডিজিএফআই ভবনে যাইনি। চব্বিশের ৫ আগস্ট পর ডিজিএফআইয়ের ডিজির ভবনে একবার গিয়েছি। আর আয়নাঘরে একবার গিয়েছি প্রসিকিউটরের সাথে। তবে ৫ আগস্ট ডিজিএফআই এলাকায় গিয়েছি বন্দীদের উদ্ধারের জন্য।
সাক্ষীর উদ্দেশ্যে আইনজীবী দুলু বলেন, ডিজিএফআইয়ের কয়টি ব্যুরো রয়েছে। জবাবে হাসিনুর বলেন, তা আমি জানি না। সিআইবির নামও শুনিনি। এ ছাড়া প্রথম দফায় যে ৪৩ দিন আর্মি ইন্টারোগেশন সেলে বন্দী ছিলাম। তার পুরো সময় চোখ বেঁধে রাখা হতো। বাথরুমে যাওয়ার সময় চোখ খুলে দিতো। তবে হাতে হাতকড়া লাগানো থাকত। ওই সময় আমাকে মাঝে মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আয়নাঘরে কয়টি সেল ছিল; এমন প্রশ্নে এই সাক্ষী বলেন, আয়নাঘরে অবস্থিত ১০টা সেল, যার একটিতে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছিল। এগুলোকে রিমান্ড সেল বলা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় জমটুপি পরানো হতো। এ সময় প্রশ্ন ছুড়ে দুলু বলেন, কিভাবে আয়নাঘর শব্দটি এলো। তখন হাসিনুর রহমান বলেন, নেত্র নিউজের এডিটর ইন চিফ তাসনিম খলিলের মাধ্যমে আয়নাঘর শব্দটি মিডিয়ায় প্রথম প্রচারিত হয়।
এরপরই আয়নাঘরে কোনো আয়না দেখতে পেয়েছিলেন কি না জানতে চান আসামিপক্ষের আইনজীবী। উত্তরে সাক্ষী বলেন, আয়নাঘর নামে যে ঘরে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছিল, তার দেয়ালে কোনো আয়না ছিল না। তবে আমাকে যে বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল তাকে যে আয়নাঘর নামে ডাকত তা আমি প্রথমে তাসনিম খলিলকে বলি। এ ছাড়া গুমের সময় রাখা কক্ষের বর্ণনা নিয়েও প্রশ্ন করেন দুলু। তখন সাক্ষী বলেন, জবানবন্দিতে আমি যে কক্ষের উচ্চতা ১৬-১৮ ফুট বলেছি। সেই কক্ষের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০-১২ ফুট ও প্রস্থ আনুমানিক ৮-১০ ফুট।
তখন আইনজীবী বলেন, আপনি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান। এর আগে, মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের সামনে অবশিষ্ট সাক্ষ্য সম্পন্ন করেন গুমের শিকার সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। সেখানে হাসিনুর রহমান জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে মুক্তির ইঙ্গিত দেয়া হয়। তবে তার আগে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাকে শর্ত দিয়ে বলেন, ‘শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, ডিজিএফআই এবং ভারত সম্পর্কে টুঁ শব্দ করা যাবে না। ফেসবুকে কিছু লেখা যাবে না। এমনকি ডিজিএফআইয়ের হেফাজতে থাকার কথা কাউকে জানালে পুনরায় গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।’ হাসিনুর জানান, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে তাকে চোখ ও হাত বেঁধে তার বাসার ১০০ গজ দূরে নামিয়ে দিয়ে যায় ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতি সাপেক্ষে এবং কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার শর্তে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।
মুক্তির পর তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘অধিকার’ ও ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’সহ বিভিন্ন দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাকে তার ওপর চলা নির্যাতনের কথা জানান। পরবর্তীতে আলজাজিরা এবং নেত্র নিউজকে ‘আয়নাঘর’ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন তিনি। ২০২২ সালে আয়নাঘরের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর তাকে ডিওএইচএসের বাসা থেকে উচ্ছেদের হুমকি দেয়া হয় এবং আইসিটি আইনে তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১০টি মামলা করা হয়। একটি মামলায় দাবি করা হয়েছিল, আয়নাঘর নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেয়ায় সরকারের ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে হাসিনুর রহমান ১৫-২০ জন স্বজনহারা সদস্যদের নিয়ে ডিজিএফআই সদর দফতরের সামনে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে তিনি পুনরায় আয়নাঘর পরিদর্শন করেন। জবানবন্দীতে তিনি বলেন, ‘পরিদর্শনের সময় দেখি আয়নাঘরের ভেতরকার অনেক চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে। দেয়ালের রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলা হয়েছে এবং অবকাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে।’ পরিদর্শনের সময় তিনি ব্রিগেডিয়ার আজমি ও মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরীকে যেখানে বন্দী রাখা হয়েছিল, সেই স্থানগুলোও শনাক্ত করেন। জবানবন্দীর শেষে হাসিনুর রহমান ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জন্য এই মামলা করিনি। আমার উদ্দেশ্য হলো, যাতে ভবিষ্যতে এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এই গুম ও নির্যাতনের জন্য শেখ হাসিনা, তারেক সিদ্দিকী এবং তৎকালীন ডিজিএফআই কর্মকর্তারা সরাসরি দায়ী। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই।’
তার জবানবন্দী শুরু হয় ২৫ জানুয়ারি। তিনি এ মামলার দুই নম্বর সাক্ষী। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
এ দিকে গতকাল বুধবারও এ মামলায় গ্রেফতার তিনজনকে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এ ছাড়া পলাতক ১০ আসামির পাঁচজনই ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক।
অন্যরা হলেন- ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এসবের সময়কাল হলো ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়টায় গুম হন ২৬ জন।



