অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সংশোধন শেষ করে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) উন্নতি ঘটেছে লেনদেন ও সূচকের। একই সময় দেশের দ্বিতীয় পুঁজিাবজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের মিশ্র আচরণের পাশাপাশি বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে লেনদেনেরও। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে প্রত্যাশিত মনে করছেন। তাদের মতে ব্যাংকিং খাতের সংশোধনে বিগত দুই কর্মদিবসে বাজারে যে নেতিবাচক প্রবণতা বিরাজ করছিল তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বাজারগুলো। তা ছাড়া এখন বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে অন্য খাতে নিজেদের বিনিয়োগ স্থানান্তর করছেন। ফলে গতকাল ব্যাংক বহির্ভূত খাতগুলোই মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সকালে ৫ হাজার ২৬৫ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৭৭ দশমিক ৮০ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪ দশমিক ১৫ ও ৪ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনের শুরুতে সূচকের বেশ ভালো অবস্থান ধরে রাখে। প্রথম একঘণ্টায় ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৩০ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে নিম্নমুখী হয়ে পড়ে সূচকটি। বেলা ১টার দিকে মাত্র ৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বাজারে অংশগ্রহণ বাড়লে ১২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট উন্নতিতে লেনদেন শেষ করে সূচকটি।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গতকাল সূচকের মিশ্র আচরণ দেখা গেছে। এখানে প্রধান সূচক সার্বিক মূল্যসূচকটি গতকাল ৭ দশমিক ০১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। তবে একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচক যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭২ ও ৫ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
সূচকের উন্নতির ফলে গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও কিছুটা উন্নতি ঘটে। বাজারটি গতকাল ৮৭৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৭ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮২৯ কোটি টাকা। তবে লেনদেনে বড় অবনতি ঘটে চট্টগ্রাম স্টকে। এখানে ৪১ কোটি টাকা থেকে ১৬ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।
এ দিকে শেয়ারবাজারে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন, বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা এবং শেয়ার লেনদেনে নানা অনিয়মের অভিযোগে চার প্রতিষ্ঠান ও তাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোট ১ কোটি ৯ লাখ টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
জরিমানার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এনবিএল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, গিবসন সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড। বিএসইসি কর্তৃক শুনানি শেষে তাদের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় গত এপ্রিল মাসে এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা য়ায়।
বিএসইসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এনবিএল সিকিউরিটিজ গ্রাহকদের ক্রয়-বিক্রয় আদেশ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে এবং গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই লেনদেন সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি না করার পাশাপাশি পেশাগত অসদাচরণের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়েদ আল-মামুন হাসানকে ৫ লাখ এবং সাবেক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা ফারজানা ফেরদৌসীকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের ওপর মোট ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অন্য দিকে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে গ্রাহক মো: আইয়ুব আলীর সঙ্গে গুরুতর প্রতারণার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। তদন্তে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে গ্রাহকের ই-মেইলে ভুয়া পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট পাঠাত এবং প্রকৃত তথ্য গোপন রাখত। ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সঠিক তথ্য পাঠানো হলেও, পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই পর্যন্ত একই ই-মেইলে জাল স্টেটমেন্ট পাঠানো হয়। এ ছাড়া গ্রাহকের মোবাইল নম্বর ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করে ভুল নম্বর যুক্ত করা হয়, যাতে তিনি সিডিবিএল থেকে লেনদেনসংক্রান্ত কোনো নোটিফিকেশন না পান। তদন্তে আরো উঠে আসে, কোম্পানির এক কর্মীর ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে এসব ভুয়া স্টেটমেন্ট পাঠানো হয়েছে, যা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এসব অনিয়মের কারণে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশা এবং কর্মকর্তা মো: শহিদুজ্জামানকে ১৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া কমপ্লায়েন্স অফিসার মো: রফিকুল ইসলাম ও কর্মকর্তা আবদুল আহাদ শেখকে ৩ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের ওপর মোট ৬৬ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে।
এ দিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানি খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডে একাধিক গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বিএসইসি। তদন্তে দেখা যায়, কোম্পানিটি টানা তিন বছর লোকসানে থেকেও কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি এবং এর সংরক্ষিত লোকসান পরিশোধিত মূলধনের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি বিএসইসির ‘এক্সিট প্ল্যানে’র আওতায় পড়ে। এ ছাড়া কোম্পানিটি তিন বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তি ফি পরিশোধ করেনি। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে শেয়ার ধারণ ও ফ্রি-ফ্লোট সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন দাখিল করেনি এবং ২০২২ সালের জুনের পর থেকে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়া বন্ধ রেখেছে। তদন্তে আরো দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়নি। পাশাপাশি কোম্পানির ওয়েবসাইট অকার্যকর ছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানি সচিব ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তার পদ শূন্য ছিল, যা করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালার লঙ্ঘন। এসব অনিয়মের কারণে কোম্পানির চেয়ারম্যান এস এম আমজাদ হোসেন, পরিচালক মো: আমজাদ হোসেন ও খান হাবিবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুফিয়া খাতুন, সিএফও মো: এজাজ উদ্দিন এবং কোম্পানি সচিব মিলন খানকে ৪ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে কোম্পানিটির মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ টাকা।
অন্য দিকে পৃথক ঘটনায় গিবসন সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফাকে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।



