খেলাপির পাহাড়ে ব্যাংকিং খাত

এক বছরে খেলাপি ঋণ টাকার অঙ্কে বেড়েছে দুই লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা; আর শতকরা হিসেবে ৬১ দশমিক ১৬ ভাগ। তবে, গত সেপ্টেম্বরের চেয়ে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। গত তিন মাসে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। এরই সুবাদে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার কমে হয়েছে মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

  • এক বছরে বেড়েছে ৬১ দশমিক ১৬ শতাংশ
  • নবায়নের কৃত্রিম স্বস্তি, মন্দ ঋণে লুকানো গভীর সঙ্কট

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি নতুন করে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, এক বছর আগে ছিল তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এ হিসেবে এক বছরে খেলাপি ঋণ টাকার অঙ্কে বেড়েছে দুই লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা; আর শতকরা হিসেবে ৬১ দশমিক ১৬ ভাগ। তবে, গত সেপ্টেম্বরের চেয়ে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। গত তিন মাসে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। এরই সুবাদে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার কমে হয়েছে মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার কমে ৩৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে আসা বাস্তব অর্থে পরিস্থিতির উন্নতি নির্দেশ করে না; বরং প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ নবায়নের কারণে সাময়িকভাবে এই হার কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে মন্দ ঋণের হার, যা ডিসেম্বরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশে, এক বছর আগে একই সময়ে যা ছিল ৮৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, খেলাপি ঋণের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেশের ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের সঙ্কট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে অনেক ঋণগ্রহীতা তাদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন। শিল্প ও বাণিজ্য খাতের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও চাপে পড়েছেন। ফলে ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ না হওয়ায় খেলাপির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

যদিও ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার কমে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকারদের মতে এটি প্রকৃত অর্থে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন নয়। কারণ বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল ও নবায়নের মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি কম দেখানো হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট কিছুটা স্বস্তি পেলেও ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে আগের জায়গাতেই। পুনঃতফসিল করা ঋণের বড় অংশই ভবিষ্যতে আবার খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মন্দ ঋণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া। সাধারণত কোনো ঋণ দীর্ঘ সময় ধরে অনাদায়ী থাকলে সেটি মন্দ ঋণে পরিণত হয় এবং তা আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম থাকে। ডিসেম্বর শেষে এই মন্দ ঋণের হার ৯৪ শতাংশে পৌঁছানো মানে খেলাপি ঋণের বেশির ভাগই এখন কার্যত আদায় অযোগ্য পর্যায়ে চলে গেছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো তাদের বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ থেকে ভবিষ্যতে আর অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন্দ ঋণ বাড়ার অর্থ হচ্ছে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মূলধন ঘাটতি আরো গভীর হবে। কারণ এসব ঋণের বিপরীতে উচ্চ হারে প্রভিশন রাখতে হয়, যা ব্যাংকের মুনাফা কমিয়ে দেয় এবং নতুন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা হ্রাস করে। এর ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণ এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের প্রতি অতিরিক্ত সুবিধা প্রদানের সংস্কৃতি এই সঙ্কটের অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম ভেঙে একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলের সহজ নীতিও খেলাপি সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু ঋণ নবায়ন বা পুনঃতফসিল করে এই সঙ্কট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর ঋণ শৃঙ্খলা, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেয়া। একই সাথে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করা জরুরি।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমলেও বাস্তব চিত্র আরো উদ্বেগজনক। কারণ মন্দ ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকিং খাতের গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি শুধু ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। তাই সাময়িক পরিসংখ্যানগত স্বস্তির বাইরে গিয়ে কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা রোধ করা এখন সময়ের দাবি।