গাজা পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হামাস নেতাদের সাথে ট্রাম্প জামাতার বৈঠক

Printed Edition
মিসরের আল-আলামিনে হামাসের দুই প্রতিনিধির সাথে মিসরীয় প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির (মধ্যে) সাথে জ্যারেড কুশনার (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)  : ইন্টারনেট
মিসরের আল-আলামিনে হামাসের দুই প্রতিনিধির সাথে মিসরীয় প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির (মধ্যে) সাথে জ্যারেড কুশনার (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) : ইন্টারনেট

আলজাজিরা ও আনাদোলু

গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হামাসের নেতাদের সাথে মিসরে বৈঠক করেছেন ট্রাম্পের জামাতা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জ্যারেড কুশনার। যদিও ইসরাইল এরই মধ্যে ওই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।

রোববার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে এক ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, বৈঠকে হামাসের নেতারা গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো কুশনারের কাছে তুলে ধরেন। কুশনার জানান, গাজার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার যেকোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করে।

বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, আল-আলামেইন শহরে হামাস ও কুশনারের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের লক্ষ্য ছিল প্রস্তাবিত রোডম্যাপের বিভিন্ন শর্তকে বাস্তব ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপে রূপ দেয়া।

ওই কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ধীরে ধীরে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’র কাছে হস্তান্তর এবং ভবিষ্যতে গাজার প্রশাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা না থাকা- এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।

বৈঠকে হামাসের রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হাইয়া উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদ, কাতারের কূটনীতিক আলি আল-থাওয়াদি এবং তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও ছিলেন। কুশনারের সাথে ‘বোর্ড অব পিস’-এর দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং বোর্ডটির সদস্য সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও বৈঠকে অংশ নেন।

হামাসের সাথে বিরল বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর মুখোমুখি ট্রাম্পের দূত

মিসরের রাজধানী কায়রোতে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বিরল বৈঠকের পর দিনই জেরুসালেমে পৌঁছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথেরুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও জামাতা জ্যারেড কুশনার।

আগামী অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ চাপেই রয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন জনমত জরিপে তার ক্ষমতাসীন জোট পিছিয়ে পড়া অবস্থায় রয়েছে। চলতি মাসেই মার্কিন সমর্থিত একটি সমঝোতা চুক্তি প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন নেতানিয়াহু। ওই চুক্তিতে ইসরাইলি বাহিনী গাজা উপত্যকা থেকে সরে যাওয়ার বিনিময়ে হামাসের অস্ত্র সমর্পণের শর্ত রাখা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগে জানিয়েছিলেন, গাজা পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। এক দিকে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া এগোবে, অন্য দিকে ইসরাইলি বাহিনী গাজা ছাড়বে। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সাথে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

তবে ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজের কঠোর অবস্থানে অনড়। তার সাফ কথা, হামাসসহ গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্পূর্ণ নিরস্ত না হওয়া পর্যন্ত তার দেশের সামরিক বাহিনী সেখানে কাজ চালিয়ে যাবে এবং কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাহার করা হবে না। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা মনে করছেন, আগামী ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে গাজা নীতিতে বড় কোনো নমনীয়তা বা ছাড় দেয়ার সম্ভাবনা নেই ইসরাইলি সরকারের।

স্থবির হয়ে পড়া গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর কুশনার

রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দু’জন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, জেরুসালেমে নেতানিয়াহুর সাথে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কুশনারের সাথে গাজা বিষয়ক ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর বিশেষ দূত নিকোলাই মলাদেনিভও উপস্থিত ছিলেন। তবে এই আলোচনার প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতিসঙ্ঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মলাদেনিভ মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সুসম্পর্কের জন্য পরিচিত। গত মাসের নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত খসড়া চুক্তিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। গত বছর ইসরাইল ও হামাস উভয় পক্ষ যে ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনায় নীতিগত সম্মতি জানিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে মলাদেনিভই প্রধান ভূমিকা রাখছেন। যদিও বাস্তবে সেই উদ্যোগের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত নামমাত্র। ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও গাজায় সামরিক অভিযান ও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। স্থবিরতা কাটাতে গত মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় তৈরি নতুন ১৫ দফার একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছিল হামাস, যা তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দেয় তেল আবিব।

এর আগে কায়রোতে অনুষ্ঠিত রোববারের মধ্যস্থতা বৈঠকে কুশনার ও মলাদেনিভের সাথে হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা খলিল আল-হায়া উপস্থিত ছিলেন বলে তথ্য প্রকাশ পায়। ওয়াশিংটনের চোখে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত হামাসের প্রতিনিধিদের সাথে এটি জ্যারেড কুশনারের দ্বিতীয় জানাজানি হওয়া সরাসরি বৈঠক। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের উপস্থিতিতে হামাস কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছিলেন কুশনার। সেই বৈঠকের সূত্র ধরেই গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনায় আটক হওয়া অবশিষ্ট বন্দীদের মুক্তির পথ সুগম হয়েছিল।

চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, হামাসসহ গাজার সমস্ত সশস্ত্র দলকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের একটি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। হামাস এতে সম্মতি প্রকাশ করলেও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়- চুক্তির বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করবে ইসরাইলের ওপর। ইসরাইলকে আগে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সৈন্য প্রত্যাহার ও সামরিক হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।