পিপিআরসির আলোচনা

হাইটেক পার্কে শত কোটি টাকার অবকাঠামো মিলছে না কাক্সিক্ষত ফল

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • ৩৯ পার্কে বিনিয়োগের পরও তৈরি হয়নি প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম
  • উদ্যোক্তাদের অভিযোগ-সহায়তার বদলে ‘ভাড়াটে’ হিসেবে বিবেচনা

দেশের প্রযুক্তিখাতকে এগিয়ে নিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং সফটওয়্যার ও আইটি পণ্য রফতানি বাড়ানো। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ৩৯টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিপুল অবকাঠামো নির্মাণের পরও প্রত্যাশিত ফলাফল মিলছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভবন, জমি ও অবকাঠামো তৈরি করলেই প্রযুক্তিশিল্প গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ, নির্ভরযোগ্য ইউটিলিটি, বাজারসুবিধা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর সহায়তা। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় অনেক হাইটেক পার্ক কাক্সিক্ষত কর্মচাঞ্চল্য তৈরি করতে পারেনি।

গতকাল শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের অ্যাজেন্ডা’ ভার্চুয়াল সিরিজের সর্বশেষ পর্ব ‘হাইটেক পার্কস : মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে শিল্পোদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ, সাবেক কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চলক ছিলেন পিপিআরসির প্রধান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. রকনুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৩৯টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলার পেছনে ধারণাটি ছিল-অবকাঠামো তৈরি করলেই হাইটেক বিপ্লব এবং বিনিয়োগ আসবে।

তার মতে, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে প্রযুক্তি পার্কের পাশাপাশি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম, দক্ষ জনবল এবং শিল্প-একাডেমিয়ার কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা হয়েছিল। বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণের ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়া হলেও এ ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ গড়ে তোলায় ঘাটতি রয়ে গেছে।

এর বাস্তব উদাহরণ যশোর হাইটেক পার্ক। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত এ পার্কে বর্তমানে প্রায় ৪০টি কোম্পানি অবস্থান করছে বলে জানান অংশ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম। তবে তার মূল্যায়ন মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

তিনি বলেন, পার্কে থাকা কোম্পানিগুলো কার্যকর ইকোসিস্টেম সহায়তা ছাড়াই নিজেদের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কর্তৃপক্ষ উদ্যোক্তাদের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা না করে অনেকটা ভাড়াটে হিসেবে দেখে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া কঠিন হচ্ছে।

তবে সব চিত্র একই রকম নয়। রাজশাহী হাইটেক পার্ককে তুলনামূলকভাবে সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন নেট্রো সিস্টেমস লিমিটেড ও টেলজেনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো: আশাফুদ্দোজা শিশির।

তিনি জানান, রাজশাহীতে ২০১৬ সালের একটি ইনকিউবেশন সেন্টারকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি উদ্যোগের যে বিকাশ শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। তবে এ সাফল্যের পেছনে পার্ক কর্তৃপক্ষের সরাসরি সহায়তার চেয়ে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগই বেশি কার্যকর ছিল বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তার অভিযোগ, রাজশাহী হাইটেক পার্কে কোম্পানিগুলোর জন্য বাস্তব সুবিধা মূলত কর অবকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্টার্টআপগুলোর জন্য অর্থায়ন, ব্যবসা উন্নয়ন, বাজারসংযোগ, দক্ষ জনবল কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তার মতো কার্যক্রমে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খুবই সীমিত।

হাইটেক পার্কের আরেকটি বড় সমস্যা উঠে আসে কালিয়াকৈরকে ঘিরে। ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা এ. রহমান বলেন, হাইটেক পার্ক নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতির একটি দীর্ঘ চক্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

তিনি জানান, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে অনেক প্রতিষ্ঠানকে জমির প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও পরবর্তীতে সহায়ক সেবা না থাকায় অনেকে সে বরাদ্দ ফিরিয়ে দিয়েছেন। ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফেল কবিরের মতে, হাইটেক পার্কের পরিকল্পনায় মৌলিক প্রযুক্তি উৎপাদনের বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। শুধু সফটওয়্যার রফতানি বা কর প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে মাদারবোর্ড, চিপ ফ্যাব্রিকেশনসহ প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল।

অন্য দিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব হাইটেক পার্কগুলোর অবস্থান নির্ধারণকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে এমন এলাকায় বড় আকারের ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে আগে থেকেই শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি, শিল্পভিত্তি কিংবা দক্ষ জনবলের বাজার ছিল না। ফলে ভবন তৈরি হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়নি।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য শুধু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ থেকে সরে এসে সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পচালিত প্রশিক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে।

আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে তাই স্পষ্ট-হাইটেক পার্কের ধারণা বাতিল করার প্রয়োজন নেই; বরং বর্তমান মডেল পুনর্গঠন জরুরি। যেসব পার্ক ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে কোথায় বিনিয়োগের ঘাটতি, কোথায় ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং কোথায় উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তার অভাব-তা চিহ্নিত করতে হবে।