যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটোতে ধরে রাখার আশা হারাচ্ছে ইউরোপীয় মিত্ররা

Printed Edition

রয়টার্স

সুয়েজ সঙ্কট, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা ইরাকে হামলা-ইউরোপের বাইরের যুদ্ধগুলো প্রায়ই ন্যাটোর ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর চলমান যুদ্ধ আরেকবার ভাঙনের মুখে ফেলে দিয়েছে এই জোটকে।

ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের বৈরী মনোভাব ক্রমে বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী চালু করার চেষ্টায় পাশে না থাকায় তিনি অনেক দেশের প্রতি ক্ষুব্ধ। এরচেয়েও বড় ক্ষোভ হলো, কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমকে আরো কঠিন করে তুলেছে। গত ২০ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘ভীরু, আমরা এটা মনে রাখব!’

সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি ‘নিঃসন্দেহে’ জোট ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। যদিও এর ১২ দিন পর ১ এপ্রিল ইরান যুদ্ধ নিয়ে টেলিভিশন ভাষণে তিনি সেই হুমকি পুনরাবৃত্তি করেননি। প্রেসিডেন্টের হুমকির প্রতিধ্বনি এসেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মুখ থেকে। ন্যাটোকে ‘একমুখী’ আখ্যা দিয়ে রুবিও বলে বসেন, ‘দুঃখজনক, তবে এটা সত্য যে, সঙ্ঘাত শেষে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নে আমাদের যেতেই হবে।’

রুবিওর আগের অবস্থান থেকে সরে আসার এ ঘোষণা ইউরোপের রাজধানীগুলোতে বিদায়ের আবহ তৈরি করেছে। সিনেটর থাকাকালে ২০২৩ সালে রুবিও একটি দ্বিদলীয় আইন করার সাথে যুক্ত ছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত যেন ঠেকিয়ে দেয়া যায়। আইনে বলা হয়, দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরের পরামর্শ ও সম্মতি ছাড়া প্রেসিডেন্ট ন্যাটোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থগিত, সমাপ্ত, প্রত্যাহার কিংবা নিন্দা জানাতে পারবেন না। এখন ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে রুবিও সেই অবস্থান থেকে সরে আসছেন।

ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূত ইভো ডালডার বলেন, ‘এটাই ন্যাটোর সবচেয়ে খারাপ সময়। ট্রাম্পকে রেখে দেয়ার চেষ্টার চেয়ে ইউরোপের মিত্রদের এখন বেশি মনোযোগ দিতে হবে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জোরদার করার দিকে।’

তার মতে, যুদ্ধকে সহায়তা না করার ইউরোপীয় সিদ্ধান্ত ন্যাটোপন্থী আমেরিকানদের অবস্থানকে খাটো করে দিয়েছে। স্পেনের বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সবচেয়ে বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। প্রতিরক্ষা ব্যয়ে জিডিপির আগের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা তিনি টেনে টুনে পূরণ করেছেন। কিন্তু নতুন সাড়ে ৩ শতাংশ এবং এর সাথে প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত অবকাঠামোতে আরো দেড় শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরানে হামলার ক্ষেত্রে স্পেন তার ঘাঁটি ও আকাশসীমা মার্কিন বাহিনীর জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।

ফ্রান্স তুলনামূলকভাবে সংযত আচরণ করছে। তাদের যুদ্ধবিমান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ড্রোন ভূপাতিত করতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে সাইপ্রাসকে রক্ষায় একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে। তবে ফ্রান্সের ভূমিকায় খুশি নন ট্রাম্প। তিনি চাইছেন, কিছু মার্কিন সামরিক বিমানকে যেন তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ব্রিটেন শুরুতে মার্কিন বাহিনীকে তার ঘাঁটি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু এখন অনুমতি দিচ্ছে। তবে সেটা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের পাল্টা হামলা থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার একাধিকবার বলেছেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।’ জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, স্যার কিয়ার ‘উইনস্টন চার্চিল নন’। প্রতিরক্ষা ব্যয়ে পিছিয়ে থাকা আরেক দেশ ইতালি সিসিলির একটি ঘাঁটি কিছু মার্কিন বিমানের ব্যবহারে বাধা দিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ইরানের সাথে উত্তরোত্তর বাড়তে থাকা সঙ্ঘাত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অন্যতম মূলনীতি ‘আন্তঃজোট সংহতি’কে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।