পুঁজিবাজার নিয়ে স্বস্তি যেমন তেমনি রয়েছে হতাশাও

সরকারের ১৮০ দিন

বিগত আওয়ামী সরকারের লম্বা সময় ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভুগতে থাকা দেশের পুঁজিবাজারগুলো শুরু থেকেই বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল নতুন সরকারের আমলে পুঁজিবাজারের পূর্ণ সংস্কার ও বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করে গড়ে তোলা হবে। সরকার গঠনের পর বিগত ১৮০ দিনে পুঁজিবাজারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ প্রত্যাশার প্রাপ্তি যেমন রয়েছে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে হতাশাও।

নাসির উদ্দিন চৌধুরী
Printed Edition

নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্ণ হলো সোমবার ১৭ আগস্ট। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। বিগত আওয়ামী সরকারের লম্বা সময় ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভুগতে থাকা দেশের পুঁজিবাজারগুলো শুরু থেকেই বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল নতুন সরকারের আমলে পুঁজিবাজারের পূর্ণ সংস্কার ও বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করে গড়ে তোলা হবে। সরকার গঠনের পর বিগত ১৮০ দিনে পুঁজিবাজারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ প্রত্যাশার প্রাপ্তি যেমন রয়েছে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে হতাশাও।

১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করা হলেও সংসদে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইন সংশোধন ও অন্যান্য কিছু কারণে বেশ কিছু সময় ব্যয় হয়। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর গত ৪ জুন নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান ও তার কমিশন দায়িত্ব নেন। এর পরই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্রিয়াশীল কমিশনের বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম ও ওই কমিশনের দ্বারা সংশোধিত বিভিন্ন বিধিবিধানকে আরো সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করার উদ্যোগ নেয় নতুন কমিশন। বড় মাপে তিনটি বিধিমালা যার মধ্যে ছিল আইপিও রুলস, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও মার্জিন রুলস। বিধিমালা তিনটির সংশোধনের কাজ চলতে থাকে, যার সবগুলোই ছিল বেশ স্পর্শকাতর। ফলে জনমত যাচাই ও বিধিসংক্রান্ত নানা জটিলতায় এতে বেশ বেশ কিছু সময় পার হয়ে যায়। সম্প্রতি মার্জিন রুলস নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হলেও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও আইপিও রুলস এখনো প্রকৃত আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নতুন তালিকাভুক্তি যেমন থেমে আছে, তেমনি মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা নিয়েও বেশ কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে।

এ দিকে নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার পারদ বেশ ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও তা খুব বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি অবস্থান করছিল ৫ হাজার ৫৭০ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে। ওই দিন দেশের প্রধান এই পুঁজিবাজারটিতে লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছিল এক হাজার ২২২ কোটি টাকা। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন পরের চিত্র খুব একটা আশাজাগানিয়া ছিল না। টানা পতনের শিকার হওয়ায় ৯ মার্চ ডিএসই লেনদেন নেমে আসে ৪১৬ কোটি টাকায়। আবার ৮ মার্চ বাজারটির প্রধান সূচক নেমেছিল ৫ হাজার ৮ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে; অর্থাৎ সরকার গঠনের পর মাত্র ১২টি কর্মদিবসের মাথায় পুঁজিবাজারটি ৫৬০ পয়েন্টের বেশি সূচক হারায়। এ ছাড়া বাজারটির লেনদেন নেমে আসে এক হাজার ২২২ কোটি টাকা থেকে ৪১৬ কোটিতে; অর্থাৎ সরকার গঠনের আগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা ছিল দ্রুতই তা হতাশায় পরিণত হয়। তবে ওই সময় এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুঁজিবাজারের এ হাল হওয়ার পেছনে দু’টি বিষয়ই বড় ভূমিকা রাখে। একটি ছিল হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু আর অন্যটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ। এই প্রথম দেশে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের বিষয়টিকে প্রথম দিকে আর্থিক খাতের কেউই ভালোভাবে নেয়নি। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরাও এর বাইরে নয়। আবার একই সময় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হলে তা গোটা বিশ্বকে নাড়া দেয়। কারণ এ যুদ্ধের একটি পক্ষ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ একপর্যায়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে গেলে সারা বিশ্বের পুজিবাজারে যে ধস নামে তার প্রভাবও ছিল দেশের পুঁজিবাজারে।

পরবর্তীতে পুঁজিবাজার নিয়ে সরকাারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ বিশেষ করে নতুন অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু নীতিসহায়তার ঘোষণা পুঁজিবাজারকে আবার সামনে এগোতে সাহায্য করে। গঠিত হয় নতুন কমিশন। বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরতে শুরু করে। এরই মধ্যে বাজেট ঘোষণা বাজারের গতিকে বেশ প্রভাবিত করে। জুন মাসের প্রায় পুরোটাই ভালো কাটে পুঁজিবাজারের। ৭ জুন দীর্ঘসময় পর প্রথমবারের মতো দেড় হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে ডিএসইর লেনদেন। জুলাই মাসে এসে তা আরো বেগবান হয়। ১২ জুলাই বাজারটির লেনদেন পৌঁছে যায় এক হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায়। ১৫ জুলাই ডিএসইর প্রধান সূচকটি ফের ৫ হাজার ৯২৬ দশমিক ২৭ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। সে হিসাবে ৮ মার্চ থেকে ১৫ জুলাই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় ৯২০ পয়েন্ট।

জুলাই মাসটি একপ্রকার ভালো কাটলেও আগস্ট মাসের শুরু থেকেই আবার মন্দার কবলে পড়ে যায় পুঁজিবাজার। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণেই সম্প্রতি বাজার আচরণের এ পরিবর্তন মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা ছাড়া বিভিন্ন কারণে দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটা স্থবির সময় পার করছে।

নতুন সরকারের এই ছয় মাসে পুঁজিবাজার নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বললে তারা বাজার ইতিবাচক মন্তব্য বলে যেমন করেছেন, তেমনি এই সময়ে বাজার নিয়ে হতাশার কথাও বলেছেন। জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ বৈশ্বিক কিছু সঙ্কটের কারণে দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটা স্থবির। তবে আমাদের বিনিয়োগকারীরা দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতি দেখতে চান। এরই মধ্যে যদি আইপিও বা ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে হলেও কিছু ভালো কোম্পানি বাজারে আনা যেত তাহলে এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো হতো না। বাজার একটি সাবলীল গতিতে থাকত, যেমন ছিল জুলাই মাসে। তবে তিনি মনে করেন, চলমান যেসব সঙ্কট রয়েছে, তা কাটানো গেলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে পুঁজিবাজার।

ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম মনে করেন, পুঁজিবাজার যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। তা ছাড়া বিএসইসি পুনর্গঠনের পর খুব বেশি সময় পার হয়নি। এরই মধ্যে তারা বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্জিন রুলস সংশোধন করা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালাও শেষ পর্যায়ে। এখন আইপিও রুলসটা শেষ করা গেলে নতুন নতুন কোম্পানি বাজারে আসবে বলে আশা করা যায়। ডিবিএ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এ সময়ে পুঁজিবাজারের অর্জন নিয়ে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।