বিশ্ব বাণিজ্যের মঞ্চে ভূরাজনীতি ও ভূঅর্থনীতির সংমিশ্রণ আবারো এক উত্তপ্ত মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ও আইনপ্রণেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন-রাশিয়ার সাথে যারা বাণিজ্য জোরদার রাখবে, মার্কিন বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার মসৃণ থাকবে না। গত ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মার্কিন সিনেটে ৮৬-১১ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়েছে, ‘খরহফংবু ঙ. এৎধযধস ঝধহপঃরড়হরহম জঁংংরধ ধহফ ওৎধহ অপঃ ড়ভ ২০২৬’। এই বিলটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দেয়- রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের (যার মধ্যে ভারত ও চীন অন্যতম) পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার।
আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, বিলটি এখনো কার্যকর হয়নি। এটি এখন প্রতিনিধি পরিষদে পাসের অপেক্ষায় আছে, যার অধিবেশন বসবে আগস্টের শেষে। ফলে ‘ভারতীয় পণ্যে এখনই ১০০% শুল্ক বসে গেছে’ তা বলা ভুল হলেও, ‘১০০% শুল্ক আরোপের শক্তিশালী আইনি পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের হাতে প্রস্তুত হচ্ছে’ বলা যায়।
শুল্কের আড়ালে ভূরাজনৈতিক কৌশল
ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক গণিত খুব স্পষ্ট। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মস্কোর প্রধান আয়ের উৎস- জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে রাশিয়াকে আর্থিক চাপে ফেলা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সস্তায় রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ভারতের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয় (চীনের পরেই)। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, দিল্লি যে সুবিধা নিচ্ছে, তা পরোক্ষভাবে মস্কোর যুদ্ধ তহবিলের সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
অন্য দিকে ভারতের অবস্থান বলা হচ্ছে দেশটির জাতীয় স্বার্থনির্ভর। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক হিসেবে নিজের শিল্প খাত রক্ষা, পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ জনগণের মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে রাশিয়ার ডিসকাউন্টেড ক্রুড অয়েল ভারতের জন্য লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে। ভারতের স্পষ্ট বক্তব্য- এটি কৌশলগত কিংবা সামরিক মিত্রতার চেয়ে বহুগুণ বেশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
১০০ শতাংশ শুল্ক প্রস্তাবের প্রত্যক্ষ প্রভাব : ভারতের উদ্বেগ
এই উদ্যোগ কার্যকর হলে ভারতের বার্ষিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৃহৎ অর্থনীতি হঠাৎ ধসে পড়বে না সত্য, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর ভারতের নির্দিষ্ট শিল্প খাতের নির্ভরতা বিশাল। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্য ছিল প্রায় ১২৯.২ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৫.৭ বিলিয়ন ডলার।
ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে ২০২৬ সালের মার্চ-মে মেয়াদের বাণিজ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ কমে ২৬.২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যদি এই নতুন বিলে উল্লেখিত ১০০% অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হয়, তবে ভারতীয় রফতানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজার প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান খাতগুলো হবে : তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল; রতœ ও অলঙ্কার; ওষুধ ও রাসায়নিক পণ্য; প্রকৌশল ও চামড়াজাত পণ্য।
অর্থনৈতিক সমীকরণ
অতিরিক্ত শুল্ক বসলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের আমদানি খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে। ফলে মার্কিন আমদানিকারক ও ব্র্যান্ডগুলোর সামনে তিনটি পথ খোলা থাকবে : প্রথমত, পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপানো (যা মূল্যস্ফীতির কারণে প্রায় অসম্ভব)। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সরবরাহকারীদের মূল্যছাড় দিতে বাধ্য করা (যা উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাবে)। তৃতীয়ত, বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করা।
তৃতীয় পথটিই ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ-শৃঙ্খল একবার হাতছাড়া হয়ে বিকল্প কোনো দেশে স্থানান্তরিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মোদি সরকারের জন্য কৌশলগত ও কূটনৈতিক পরীক্ষা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সামনে এখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখার কঠিন পরীক্ষা। ভারত এতদিন সফলভাবে এক হাতে ওয়াশিংটনের সাথে ‘কোয়াড’ ও প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব জোরদার করেছে, অন্য হাতে মস্কোর কাছ থেকে সস্তা তেল ও সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে।
কিন্তু ওয়াশিংটনের নতুন কঠোর শুল্ক প্রস্তাব সেই দুই কূল রক্ষা করার সুযোগ কমিয়ে আনছে। ভারত যদি সস্তা রুশ তেল কেনা বন্ধ করে, তবে তাদের নিজস্ব জ্বালানি ব্যয় বাড়বে এবং অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। আর যদি তেল কেনা অব্যাহত রাখে, তবে মার্কিন বাজারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রফতানি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে নয়াদিল্লিকে এখন এই দুই অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে নতুন ভারসাম্য বিন্দু খুঁজে বের করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগের নতুন জানালা
ভারতের বাণিজ্য ঝুঁকির এই সম্ভাব্য ফাটলেই তৈরি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক নতুন সম্ভাবনা- বিশেষ করে তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে।
১. বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র নতুন বাণিজ্য কাঠামোর সুবিধা : ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অমৎববসবহঃ ড়হ জবপরঢ়ৎড়পধষ ঞৎধফব স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রবর্তিত বাণিজ্য শুল্ক সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই চুক্তিতে মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তুব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদিত নির্দিষ্ট পরিমাণের তৈরী পোশাকের জন্য বিশেষ টিআরকিউ (ঞধৎরভভ-জধঃব ছঁড়ঃধ) ব্যবস্থার অধীনে শূন্য শুল্ক সুবিধা রাখা হয়েছে। ভারতীয় টেক্সটাইল খাতের রফতানিকারকেরাও ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই ব্যবস্থার কারণে মার্কিন আমদানিকারকরা ভারত ছেড়ে দ্রুত বাংলাদেশে অর্ডার স্থানান্তরিত করবে।
২. কেন বাংলাদেশ বিকল্প হতে পারে : ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে (যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.৩% বৃদ্ধি)। ভারত যদি ১০০% শুল্কের মুখোমুখি হয়, তবে বৈশ্বিক খুচরা বিক্রেতারা তাদের পোশাক সোর্সিংয়ের বড় একটি অংশ বাংলাদেশে নিয়ে আসবে।
তবে বাংলাদেশের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই : দেশের সামনে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতীয় বাণিজ্যে ধস নামলেই বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজয়ী হবে- এই ধারণায় বসে থাকা মারাত্মক ভুল হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শুধু শুল্ক নয়, সরবরাহ সক্ষমতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা একটি ফ্যাক্টর হতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ তুলা, সুতা, কাপড়, রঞ্জক পদার্থ ও যন্ত্রাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। ভারতের বস্ত্র খাতে বড় কোনো ধস বা সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হলে বাংলাদেশের কাঁচামাল আমদানির খরচ ও সময় বেড়ে যাবে। এ ছাড়া ভারত যদি মার্কিন বাজার হারায়, তবে তারা তাদের উদ্বৃত্ত টেক্সটাইল ও শিল্পপণ্য কম দামে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ বা ইউরোপীয় বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন।
মার্কিন অর্ডারের নতুন জোয়ার সামলাতে হলে বাংলাদেশকে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত ও অটোমেটেড করতে হবে। লিড-টাইম কমাতে না পারলে সেই অর্ডার অন্য দেশে চলে যাবে।
নীতিনির্ধারণী বার্তা
মার্কিন সিনেটে প্রস্তাবিত ১০০ শতাংশ শুল্ক বিলটি ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক নীতিতে এক নতুন কঠোরতার বহিঃপ্রকাশ। ভারতের জন্য এটি শুধু বাণিজ্যের ক্ষয়ক্ষতি নয়- বরং তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সামনে এক কঠিন অর্থনৈতিক দ্বিধা। আর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত সুযোগ।
কিন্তু মার্কিন বাজারের এই সম্ভাব্য অর্ডার স্থানান্তর কেবল তখনই দীর্ঘস্থায়ী সুফল আনবে, যখন বাংলাদেশ : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধাগুলো পুরোপুরি কার্যকর করবে। মার্কিন তুলাভিত্তিক সমন্বিত টেক্সটাইল সাপ্লাই চেইন তৈরি করবে। কারখানাগুলোতে আন্তর্জাতিক শ্রমমান, পরিবেশগত সুশাসন এবং আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করবে।
সুযোগের দরজা হয়তো খুলে যাচ্ছে, কিন্তু সেই দরজায় পা রাখার যোগ্য প্রস্তুতি বাংলাদেশের রয়েছে কি না- আসন্ন দিনগুলোতে ঢাকার অর্থনৈতিক দূরদর্শিতাই তার উত্তর দেবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।



