দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, টানা ভারী বর্ষণ ও তীব্র জলাবদ্ধতার মধ্যেই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তীব্র বিরূপ আবহাওয়ার কারণে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতি, প্রশ্নপত্রের ত্রুটি ও কাঠিন্য এবং কর্তৃপক্ষের কিছু বিতর্কিত মন্তব্য শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভকে আরো উসকে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আন্দোলন কেবল পরীক্ষা পেছানোর দাবি নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রশাসনের সুশাসন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণ প্রজন্মের দাবি বা ক্ষোভকে অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই; বরং তাদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ ও প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে সরকারের উচিত হবে না রাজপথের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে দূরত্ব বাড়ানো, বরং জাতীয় সঙ্কটে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এবং বই-খাতা বন্যায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় পরীক্ষা স্থগিত রাখার জোর দাবি উঠলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুরুতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। পরিস্থিতি আরো জটিল হয় যখন প্রথম দিকের পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্রে বড় ধরনের ত্রুটি ও কাঠিন্য দেখা দেয়। এর ওপর দায়িত্বশীলদের কিছু তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করে। অনেকেই বলছেন, সঙ্কটের শুরুতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, জনদুর্ভোগের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্লিপ্ততা আন্দোলনকে আরো উসকে দিয়েছে।
প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রিক চলমান সঙ্কটে শিক্ষা প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। যেকোনো দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে নমনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত ছিল। শিক্ষা খাত যেহেতু দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তাই শিক্ষানীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের আরো বেশি দূরদর্শী পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন নীতিনির্ধারকদের জন্য কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে : সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যখন দাবি করা হয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক, অথচ বাস্তব চিত্রে শিক্ষার্থীরা কোমর সমান পানি ভেঙে কেন্দ্রে যাচ্ছে, তখন প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা সঙ্কটে পড়ে।
শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র বা সরকারের প্রতিপক্ষ নয়। তাদের যৌক্তিক দাবিকে শুরুতেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে গড়পড়তাভাবে ‘উসকানি’ বা ‘বহিরাগতদের কাজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পুরনো প্রবণতা আবারো হিতে বিপরীত হয়েছে। বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পরীক্ষা পদ্ধতি কিভাবে নমনীয় করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশিকা (গাইডলাইন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছিল না। আন্দোলনের মুখে শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের ঘটনা ইঙ্গিত করে যে, ভেতরে ভেতরে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে প্রশাসন।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, পরীক্ষা নেয়া বা না নেয়ার সিদ্ধান্ত ডিসি ও ইউএনওদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে। তিনি সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়েই পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে বিশিষ্টজনদের মতে, জাতীয় একটি পাবলিক পরীক্ষার নীতিগত সিদ্ধান্ত ও দায় এভাবে মাঠ প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী। তদুপরি সায়েন্স ল্যাব বা সংসদ ভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। বিগত দিনেও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগের পরিণতি শুভ হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, দুর্যোগের জন্য বিকল্প তিন সেট প্রশ্ন প্রস্তুত ছিল। প্রশ্ন উঠছে- বিকল্প ব্যবস্থা যদি ছিলই, তবে বন্যাদুর্গত এলাকার পরীক্ষাগুলো শুরুতেই কেন স্থগিত করা হলো না? এই অস্বচ্ছতা প্রশাসনের সমন্বয়হীনতাকেই স্পষ্ট করে।
এ দিকে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তা সরকারের কাছে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পায়। তবে তারা স্বীকার করছেন, মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদনের কারণে হয়তো পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন শুরুতে করা সম্ভব হয়নি। একই সাথে তাদের অভিযোগ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে কোনো কোনো রাজনৈতিক মহল ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।
অন্য দিকে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের নেতারা এ ঘটনাকে সরকারের সামগ্রিক সুশাসনের দেউলিয়াত্ব হিসেবে দেখছেন। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান নয়া দিগন্ত-কে বলেন, ‘যেখানে দেশের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী, শিক্ষার্থীরা আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে, সেখানে জোর করে পরীক্ষা চাপিয়ে দেয়া অমানবিক। সরকার জনগণের পালস বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই সঙ্কটের দায় এড়াতে পারে না। আমরা শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবির সাথে একমত এবং তাদের ওপর যেকোনো ধরনের বলপ্রয়োগের নিন্দা জানাই।’
জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের নয়া দিগন্তকে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক ছিল। সরকারের উচিত ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে আগেই এর সমাধান করা। তিনি বলেন, এক দিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করেছে, অন্য দিকে শিক্ষামন্ত্রী অনভিপ্রেত একটি বক্তব্য দিয়েছেন। এতে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়। তিনি বলেন, সরকারের উচিত হবে শিক্ষার্থীদের কথা সহানুভূতির সাথে শোনা। এটি না হলে জুলাই আকাক্সক্ষার আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। একই সাথে সরকারের জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক কষ্ট, দুর্ভোগ ও শিক্ষামন্ত্রীর অবজ্ঞাসূচক আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে বলে নয়া দিগন্তকে জানান এ বি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, তরুণদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা মোটেও উচিত নয়। প্রবল বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে তাদের পরীক্ষা দিতে যে অসুবিধা হয়েছে এবং প্রশ্নপত্রে ভুলজনিত সমসথ্যাগুলোকে মানবিক দিক থেকে সরকার যদি আগেই বিবেচনায় নিতো তাহলে এ সমস্যা হতো না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুউদ্দীন পাটওয়ারী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর যে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছে, জমে থাকা সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে রাজপথে। এটি শিক্ষা সংস্কারের আন্দোলন, সরকার পতনের আন্দোলন নয়। অযথা শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি জটিল না করে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী সমাধান করুন।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এই চরম ভোগান্তি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের কষ্ট ও ক্ষোভের সাথে আমরা সংহতি জানাই। শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্রদল সবসময় পাশে থাকবে।’
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই আন্দোলনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। তাদের মতে, শিক্ষা খাতের সুশাসন কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন বা যথাসময়ে পরীক্ষা নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা ও মানবিক মূল্যবোধ জড়িয়ে রয়েছে। জীবনের চেয়ে কোনো পরীক্ষাই বড় হতে পারে না। জোর করে পরীক্ষা নেয়ার ফলে যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকল, তাদের শিক্ষাবর্ষের এই ক্ষতির দায় কে নেবে? প্রশ্নপত্রের ত্রুটির জন্য পূর্ণ নম্বর দেয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশনের দুর্বলতা দূর করাই সুশাসনের দাবি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের ‘প্রতিপক্ষ’ ভাবার মানসিকতা পরিহার না করলে এ ধরনের সামাজিক অসন্তোষ বারবার ফিরে আসবে।



