অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
রোববার সূচকের অস্বাভাবিক পতনের পর আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পুঁজিবাজার। গতকাল সোমবার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। এর আগের দিন দুই পুঁজিবাজার বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন প্রত্যক্ষ করে। ওই দিন ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটি ২৩১ পয়েন্টের বেশি অবনতির শিকার হয়। গতকাল এ হারানো সূচকের অর্ধেকের বেশি ফিরে পায় বাজারটি। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগের দিনের অস্বাভাবিক পতনের কারণে গতকাল মূল্যস্তর বিবেচনায় বিনিয়োগকারীরা বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চেয়েছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৩২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৫ হাজার ৮ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১৪১ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। বড় ধরনের বিক্রয়চাপ দিয়ে লেনদেন শুরু করলেও দ্রুতই তা সামলে নেয় বাজারটি। দিনের বাকি সময় কমবেশি বিক্রয়চাপের শিকার হলেও লেনদেনের শেষ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি এসব চাপ ঠেকিয়ে দেয়। আর এভাবে প্রধান সূচকটির বড় উন্নতি ধরে রেখেই দিন শেষ করে ডিএসই। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৫৫ দশমিক ৮৮ ও ২১ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০১ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৪৫ দশমিক ৩১ ও ৬২ দশমিক ১৫ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, রোববারের অস্বাভাবিক এ পতন বিনিয়োগকারীদের মাঝে এক ধরনের জেদ তৈরি করে দিয়েছে। আর এটাই গতকাল তাদেরকে ঝুঁকি নিতে সাহস জোগায়। কারণ বরাবরই দেখা গেছে, টানা পতনের পর যখনই বাজার ঘুরে দাঁড়াবার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই কোনো না কোনোভাবে একটি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যায় পুঁজিবাজার। এর রেশ চলতে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। বিনিয়োগকারীদের আর লাভের মুখ দেখা হয় না। আর এভাবেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে লোকসানই গুনে চলেছেন বিনিয়োগকারীরা। তাই হয়তো পতন ঠেকাতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। লেনদেনের শেষদিকে এসে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি এটাই প্রমাণ করে।
সূচকের উন্নতি ঘটলেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে অবনতি ঘটেছে লেনদেনের। ডিএসই গতকাল ৪১৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১১৫ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৩১ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল বাজারটি ৪৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩২ কোটি টাকা বেশি। রোববার বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ১৬ কোটি টাকা। তবে গতকালের লেনদেনের বড় অংশই দখলে ছিল তিনটি কোম্পানির। এদের মধ্যে সিটি ব্যাংক ২০ কোটি টাকা, ওরিয়ন ইনফিউশন ১৪ কোটি ও ফাইন ফুডসের ৮ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
গতকাল মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে বিনিয়োগকারীদের সার্বিক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন পর আশার আলো খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ভয়াবহতা তার পুরোটাই মাটি করে দিলো। তার ওপর রোববার বাজারের যে পরিমাণ পতন ঘটলো তা কেউ মেনে নিতে পারেনি। এ জন্যই আজ (গতকাল) এভাবে মরিয়া হয়েই ঝুঁকি নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করেন, যুদ্ধতো কারো হাতেই নেই। কিন্তু আমরা কেন আমাদের নিজেদের কষ্টার্জিত পুঁজি হারাবো? তাই সবাই একটু আগ্রাসী ভূমিকায় ছিল। তবে এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের। তারা তাদের সক্ষমতা ব্যবহার করে বাজার পাল্টে দিয়েছ্।ে
দিনের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সূচকের উন্নতির পেছনে গতকালও বড় অবদান ছিল ব্যাংকিং খাতের। গতকাল এই খাতের শত ভাগ মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কোম্পানির ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে যা সূচককে এগিয়ে নিয়ে যায়। কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া। এসব কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশের বেশি। মূলত এরাই গতকাল বাজার সূচককে বড় ধরনের ব্যবধানে এগিয়ে নেয়। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতের ভূমিকাও ছিল চোখে পড়ার মতো। এ খাতগুলোতেও মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে শত ভাগ কোম্পানি। তা ছাড়া দিনের লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিও ফান্ডের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি সিকিউরিটিজের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮৮টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি পায় ৩৫১টির। বিপরীতে দর হারায় মাত্র ১৭টি। অপরিবর্তিত ছিল ২২টি সিকিউরিটিজের দর।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৭ লাখ ২১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২১ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় ৭৫ লাখ ২০ হাজার শেয়ার করে সিটি ব্যাংক ছিল দ্বিতীয়।
ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, রবি অজিয়াটা, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ইস্টার্ন ব্যাংক, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ও ফাইন ফুডস।
ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানি ছিল ইসলামী ব্যাংক। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটায় এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সিটি ব্যাংক। ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এবি ব্যাংক, ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, পি এইচ পি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও রূপালী ইন্স্যুরেন্স।



