শাহ আলম নূর
ভারত থেকে কম দামে সুতা আমদানি হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের স্পিনিং মিল শিল্প গভীর সঙ্কটে পড়েছে। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাবি-গত অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ, যা কার্যত একটি ডাম্পিং কৌশল। এর ফলে ইতোমধ্যে ৫০টির বেশি সুতাকল বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সঙ্কট শুধু একটি উপখাতের নয়-এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের অস্তিত্ব সঙ্কট।
‘প্রতি কেজিতে ৩০ সেন্ট কম’: ডাম্পিংয়ের অর্থনীতি
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘ভারতের ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৩০ সেন্ট কম দামে বাংলাদেশে সুতা রফতানি করছে। এই দামে দেশীয় স্পিনিং মিল টিকে থাকা অসম্ভব।’
নানা কারণে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন খরচ বাড়ছে- গ্যাস ও বিদ্যুৎ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ব্যাংক ঋণের সুদ দাঁড়িয়েছে ১২-১৫ শতাংশে, ডলার সঙ্কট ও কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বেড়েছে। আর অন্যদিকে ভারতীয় মিলগুলো পাচ্ছে- স্বল্প সুদের অর্থায়ন, সরকারি ভর্তুকি, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ। এর ফলে প্রতিযোগিতাটি সমান মাঠে হচ্ছে না-এটাই হলো মূল অভিযোগ।
১০ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত
বিটিএমএর হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় মিলগুলোতে বর্তমানে ১০ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে আছে। প্রকৃত বাজারমূল্যে এই মজুদের দাম প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল স্টক আটকে থাকায়- ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে না। এতে শ্রমিকের মজুরি ও ইউটিলিটি বিল মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নতুন উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক মালিক কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তে বাধ্য হচ্ছেন।
বিটিএমএ সভাপতি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা সুতার জন্য ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। অতীতে ভারত একাধিকবার বিনা কারণে তুলা ও সুতা রফতানি বন্ধ করেছে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল বাণিজ্যিক ঝুঁকি নয়, বরং কৌশলগত ঝুঁকি। কারণ- বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ৬০-৬৫% কাঁচামাল আসে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ থেকে। এই সংযোগ ভেঙে গেলে পোশাক রফতানি সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বে। ভারত যদি ভবিষ্যতে নীতিগত সিদ্ধান্তে সুতা সরবরাহ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ২২ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল-গার্মেন্ট ভ্যালু চেইন ভেঙে পড়তে পারে।
সরকার ও নীতিনির্ধারণে তীব্র সমালোচনা করে এক মতবিনিময় সভায় বিটিএমএ সভাপতি সরাসরি বলেন, ‘বর্তমান সরকার নতুন কারখানার জন্ম দিতে না পারলেও বন্ধ করেছে। ২৫০-এর বেশি পোশাক কারখানা, ৫০-এর বেশি বস্ত্রকল বন্ধ।’
তিনি দাবি করেন- অর্ধেকের বেশি কারখানা আংশিক বন্ধ। আর গত এক বছরে শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। এই বক্তব্যে শিল্পমহলের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রতিফলিত হয়।
‘এই খাত এখন আইসিইউতে’ বলে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ‘এই সেক্টরকে এখন আর অক্সিজেন দিয়ে বাঁচানো যাবে না। এটি আইসিইউতে চলে গেছে।’
তিনি জানান-টেক্সটাইল খাতের আকার প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। চলতি বাজেটে করহার বেড়ে হয়েছে ২৭ শতাংশ, যা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। তার মতে, সরকার যদি এখনই বড় সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে- স্পিনিং মিল ধসে পড়বে, এরপর পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ভেঙে যাবে।
ব্যাংক ঋণ ও জ্বালানি : সঙ্কটের ত্রিমুখী চাপ
বর্তমানে স্পিনিং মিলগুলোর বাস্তবতা হলো- সুতা বিক্রির টাকা যাচ্ছে শুধু শ্রমিক মজুরি ও গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল দিতে। মূলধন বা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ নেই। এই অবস্থায় বিটিএমএ দাবি করেছে- সুতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রফতানিতে ১০% নগদ সহায়তা, ইডিএফ তহবিলের পরিমাণ বাড়ানো ও সুদ কমানো, ব্যাংক ঋণে গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানো এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কমানোর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী- শিল্প খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে, খেলাপি ঋণ ৩৫% ছাড়িয়েছে, ব্যাংকগুলো নতুন শিল্প ঋণে অনীহা দেখাচ্ছে। এর মধ্যে যদি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে- শিল্প উৎপাদন আরো কমবে, কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হবে এবং রফতানি সক্ষমতা দুর্বল হবে। অর্থাৎ, সুতা সঙ্কট এখন ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে।
বিশ্লেষণ : সামনে কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সামনে তিনটি পথ- প্রথমত, বাণিজ্য প্রতিরক্ষা, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ, ভ্যালু ডিক্লারেশন কঠোর করা। দ্বিতীয়ত, শিল্প বাঁচানোর নীতি গ্রহণ, টেক্সটাইলের জন্য আলাদা ইই উইন্ডো এবং সুদ ও জ্বালানি ভর্তুকি প্রদান করা। তৃতীয়ত, কৌশলগত স্বনির্ভরতা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজকে ‘স্ট্র্যাটেজিক সেক্টর’ ঘোষণা এবং ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানো।
বাংলাদেশের স্পিনিং মিল সঙ্কট কেবল একটি শিল্পের নয়- এটি দেশের রফতানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আজ যদি এই খাতকে বাঁচানো না যায়, আগামী দিনে পোশাক শিল্পও টিকবে না। সময় এখন সিদ্ধান্তের- নইলে সুতার সাথে সাথে খুলে যাবে অর্থনীতির জট।



