ব্যবসায়ীদের অবৈধ সুবিধা দেয়ার ১৫ বছরের নথি তলব

বাকিতে প্রভিশন রাখার সুযোগ দিয়ে ব্যাংকগুলো প্রকৃত মুনাফা না করেও কাগুজে মুনাফার মাধ্যমে ডিভিডেন্ডের নামে ব্যাংকের অর্থ বের করে নিয়েছে দখলদার ব্যাংকমালিকরা।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
  • নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে ১০ গ্রুপকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণপুনর্গঠন
  • নয়ছয় সুদে মাফিয়া ব্যবসায়ী গ্রুপের ঋণ নবায়ন
  • প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে তিন বছরে ৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাট হওয়া খাতগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল দেশের ব্যাংক খাত। মাফিয়া কিছু ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। কখনো নামমাত্র অর্থাৎ এক বা দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনর্গঠন, কখনো নয়ছয় সুবিধা দিয়ে সুদ মওকুফ করা, কখনো বা ন্যূনতম অর্থ পরিশোধ করে সেফ এক্সিট দেয়া হয়েছে কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রুপকে। এসব সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে ওই ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ না করেই ঋণখেলাপি থেকে মুক্ত থেকে নতুন ঋণের নামে অর্থ বের করে নিয়েছে; আবার খেলাপি হয়েছে। আবার নীতি সহায়তার মাধ্যমে খেলাপি মুক্ত করা হয়েছে। অপর দিকে বাকিতে প্রভিশন রাখার সুযোগ দিয়ে ব্যাংকগুলো প্রকৃত মুনাফা না করেও কাগুজে মুনাফার মাধ্যমে ডিভিডেন্ডের নামে ব্যাংকের অর্থ বের করে নিয়েছে দখলদার ব্যাংকমালিকরা। এমন পরিস্থিতিতে নীতি সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের অবৈধ সুযোগ সুবিধা দেয়ার ১৬ বছরের সব নথি বাংলাদেশ ব্যাংককে পাঠাতে বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল এ সংক্রান্ত চিঠি দুদক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে ১০ গ্রুপকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণপুনর্গঠন : বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ছিলেন যারা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের মাফিয়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষ করে সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে ওইসব ব্যবসায়ীদের নীতি সহায়তার মাধ্যমে সুবিধা দিতেন। এর অংশ হিসেবে তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর শিতাংসু কুমার সুর চৌধুরীর নির্দেশে ঋণ পুনর্গঠনের নামে কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপকে অবৈধ সুবিধা দেয়ার জন্য নীতি সহায়তা দেয়া হয়। তখন বলা হয়, ৫০০ কোটি টাকা ও ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণ খেলাপি রয়েছেন এমন ব্যবসায়ীদের ঋণ নবায়নের করতে মাত্র ২ ও ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের কথা বলা হয়। যেখানে ঋণ নবায়নের জন্য এককালীন নগদে পরিশোধ করার কথা রয়েছে খেলাপি ঋণের। যেমন- কোনো একটি গ্রুপের খেলাপি ঋণ ১০০ কোটি টাকা। ওই গ্রুপের ঋণ নবায়ন করতে হলে ১৫ কোটি টাকা এক কালীন পরিশোধ করতে হবে। আর এ নীতিমালার অন্যতম কারণ ছিল কোনো ঋণখেলাপি যাতে নতুন করে ঋণ নিতে না পারেন। আর নতুন করে ঋণ নিতে হলে ১৫ শতাংশ ডাউন্ট পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়ন করতে হবে। এ নীতিমালার কারণে ঋণগ্রহীতারাও যেমন সচেতন থাকতেন খেলাপি ঋণ হওয়ার জন্য, তেমনি কেউ খেলাপি হলে নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ এককালীন পরিশোধ করলে ব্যাংকের আদায় বেড়ে যায়। কমে যায় ঋণ ঝুঁকি। কিন্তু এ নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ সুবিধায় মাত্র এক ও দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেয়ার সুযোগ দেয়া হয় বড় ঋণখেলাপিদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতি সুবিধার কারণে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ ১০ ব্যবসায়ী গ্রুপ মাত্র এক ও দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করে। এ পরিমাণ খেলাপি ঋণ বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী নবায়ন করতে হলে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতো তাদের। এতে ব্যাংকের আদায়ও বাড়ত। সেখানে নীতি সুবিধা দেয়ায় মাত্র দেড় শ’ কোটি টাকা পরিশোধ করা লাগে ব্যবসায়ীদের। এভাবে ঋণ পুনর্গঠনের নামে মাফিয়া কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপকে ছাড় দেয়া হয়। ঋণপুনর্গঠন নীতিমালা অনুযায়ী একজন ব্যবসায়ী এ সুবিধা নিলে আর সেইক্ষেত্রে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলে নতুন করে আর কোনো সুবিধা নিতে পারবে না। কিন্তু সালমান এফ রহমান বড় অংশের ঋণ নবায়ন করে তা আর নিয়মিত পরিশোধ করেননি। কিন্তু তার পরেও তিনি নতুন নতুন সুবিধা নিয়ে বছরের পর বছর সুদ মওকুফসহ নতুন করে ঋণের নামে অর্থ বের করে নিয়েছেন।

নয়ছয়ের মাধ্যমে সুবিধা : ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা কাটতে না কাটতেই নয়ছয়ের সুবিধা আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে মাফিয়া ব্যবসায়ী গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নিত। ব্যাংকগুলো সাধারণ কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করে থাকে। ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান হলেও মুনাফা। যেমন- ১০ শতাংশ আমানত নিয়ে ১৫ শতাংশে বিতরণ করা হলে শতকরা ব্যাংকের পরিচলন মুনাফা হয় ৫ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করে এক সার্কুলার জারি করে নয়ছয় সুবিধা দেয়ার জন্য। যেখানে গ্রাহক ১০০ টাকা আমানত রাখলে ব্যাংক তাকে ১০ টাকা মুনাফা দিত, তা রাতারাতি ৬ টাকা করা হয়। অপর দিকে ১০ টাকা সুদে আমানত নিয়ে ১৫ টাকা সুদে ঋণের সুদও রাতারাতি ৯ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। আর মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়ীদের ঋণ নবায়ন করা হয় ৯ শতাংশ সুদে। এর ফলে একটি ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণের ব্যাংকের মুনাফা বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৮শ’ কোটি টাকায় নেমে যায়। কিন্তু অপর দিকে শর্ত অনুযায়ী আমানতকারীদের সুদ ১০ শতাংশই পরিশোধ করা হয়। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয় নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট দিয়ে। এভাবে ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে সবল করা হয় কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে। আর এ সুবিধার অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়।

প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে সুবিধা : নয়ছয়ের সুবিধা যেতে না যেতেই আনা হয় প্রণোদনা প্যাকেজ। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তের কথা বলে মাত্র ৪ ও ৫ শতাংশ সুদে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, বড় শিল্প গ্রুপগুলোর জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। ৪ শতাংশ সুদে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গ্রপের ঋণ এবং বৃহৎ শিল্পের জন্য ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয় ৫ শতাংশ। এতে সরকার ব্যাংকগুলোকে ৫ ও ৪ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ করোনা প্যাকেজের ঋণের একটি বড় অংশই নিয়ে যায় মাফিয়া কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপ। এভাবে তিন বছরে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা বিতরণ করে ব্যাংকগুলো। আর ব্যাংক যাতে সহজেই বিতরণ করতে পারে সেজন্য সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে টাকার জোগান দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এভাবেই নীতিসহায়তার মাধ্যমে কিছু গ্রাহককে সুবিধা পাইয়ে দেয়া হয়।

বাকিতে প্রভিশন রাখার সুযোগ : এস আলম, বেক্সিমকো, সামিট, নাসাসহ বড় কিছু মাফিয়া ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসহায়তার মাধ্যমে পরিশোধ না করে বছরের পর বছর পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসেবে একমাত্র এস আলম গ্রুপই ইসলামী ব্যাংকসহ ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রাতিষ্ঠান থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ নেয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্তের আওতায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০ শিল্প গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা। তারা ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার মাধ্যমে বছরের পর বছর পরিশোধ না করায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত দুর্বল হতে থাকে। এক দিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়, অপর দিকে প্রকৃত ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় মুনাফাও কমে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার মাধ্যমে প্রকৃত মুনাফা না হলেও কাগুজে মুনাফার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ লভ্যাংশ আকারে বের করে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। অপর দিকে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য খেলাপি ঋণের বিপরীতে ক্ষেত্রবিশেষ শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সাধারণত প্রভিশন ঘাটতি থাকলে মুনাফা বিতরণ করতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপি ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শিথিলতা আরোপ করা হয়। দেয়া হয় বাকিতে প্রভিশণ রাখার সুযোগ। যেমন- একটি ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওই ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা না হয়ে ২০০ কোটি টাকা লোকসান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাকিতে প্রভিশন রাখার সুযোগ দেয়া হয়। যেখানে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রভিশন রাখার কথা সেখানে ৫০০ কোটি টাকা প্রভিশন রেখে ৭০০ কোটি টাকা ৫ বছরের মধ্যে সংরক্ষণের অদ্ভুত সুযোগ দেয়া হয়। এতে দেখা গেল যেখানে ২০০ কোটি টাকা লোকসান হওয়ার কথা, সেখানে মুনাফা হলো ৫০০ কোটি টাকা। আর এই ৫০০ কোটি টাকা থেকে কর্পোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করে বাকি অর্থ মুনাফা আকারে ভাগবাটোয়ারা করে নিলো ব্যাংকের পরিচালকরা। এভাবেই ব্যাংকগুলোর বকেয়া প্রভিশন ব্যাপক আকারে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক ব্যাংকের মূলধন কাঠামো ঝুঁকির মধ্যে চলে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ৫ আগস্টে বিদায় নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জোরাল পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথমে ১০টি শিল্প গ্রুপকে বেছে নেয়া হয়। পরবর্তীতে আরো ১০টি শিল্প গ্রুপকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বড় শিল্প গ্রুপগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিলের মাধ্যমে কী পরিমাণ সুবিধা নিয়েছে, এ নীতিমালা জারির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারা কারা জড়িত ছিলেন তা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য ২০০৯ সালের পর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত কী পরিমাণ নীতিমালা জারি করা হয়েছে তার নথি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তলব করেছে দুদক। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দুদক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।