বেজার ৪১ হাজার একর জমি ফেরত চায় বন বিভাগ

Printed Edition
অব্যবহৃত জমি ফের বনাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে : নয়া দিগন্ত
অব্যবহৃত জমি ফের বনাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে : নয়া দিগন্ত

এম মাঈন উদ্দিন মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে ২০১২ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে ২২ হাজার ৩৩৫ একর উপকূলীয় বনভূমি হস্তান্তর করেছিল বন বিভাগ। শিল্পনগর নির্মাণের জন্য সেই বনভূমির বড় অংশের গাছ কেটে ফেলা হলেও অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়া একটি অংশে আবারো প্রাকৃতিকভাবে বন গড়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অব্যবহৃত চার হাজার ১০৪ একর বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বেজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জের কর্মকর্তা শাহেনশাহ নাওশাদ বলেন, বনভূমি ফেরত চেয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হলেও এখনো জমি হস্তান্তর করা হয়নি।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাইয়ের সাহেরখালী, ইছাখালী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় একসময় বিস্তীর্ণ কেওড়া, গেওয়া ও বাইনগাছে ঘেরা বন ছিল। সেখানে হরিণ, শিয়াল, মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানর, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও অসংখ্য পাখির আবাস ছিল। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বনভূমির বড় অংশ উজাড় হওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে। বন কর্মকর্তারা জানান, একসময় এই উপকূলীয় বনে ১০ থেকে ১২ হাজার হরিণ ছিল। বর্তমানে ১৫ শতাংশ টিকে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। গত চার বছরে বন বিভাগ আটটি হরিণ উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে চারটিই ছিল মৃত।

চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি প্রধান বন সংরক্ষক মো: আমীর হোসাইন চৌধুরী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের পশ্চিমাংশে চার হাজার ১০৪ একর জমি এখনো অব্যবহৃত রয়েছে। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে গেওয়া, কেওড়া, হারগোজাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ জন্মেছে। এসব গাছে ঘন বন তৈরি হয়েছে এবং সেখানে হরিণ, মেছোবাঘ, সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর বিচরণ রয়েছে। শিল্পাঞ্চল থেকে ভবিষ্যতে নির্গত কার্বন শোষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এই বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জমিটি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুপারিশ করা হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জিরো পয়েন্ট থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত সুরক্ষা বাঁধ ধরে দক্ষিণে ডোমখালী খাল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন করে বন গড়ে উঠেছে। বাঁধের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, আর পূর্ব পাশে কাটা গাছের গোড়া থেকে জন্ম নেয়া গেওয়া ও কেওড়ার সারি। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অংশে বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ হরিণের বসবাস থাকতে পারে। দিনের বেলায়ও দলবেঁধে হরিণের বিচরণ দেখা যায়। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতিও চোখে পড়ে।

বন বিভাগের দাবি, ২০১২ সালে বেজার কাছে হস্তান্তরের সময় জমিগুলো সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার প্রক্রিয়ায় ছিল। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জমিগুলো বেজার কাছেই হস্তান্তর করে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, বন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী কার্যক্রম নেয়া হবে। বেজার সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, যেখানে এখনো কোনো শিল্প অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, সেখানে নতুন করে বন সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগ ও বেজা যৌথভাবে আলোচনা করলে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, যে চার হাজার ১০৪ একর জমি ফেরত চাওয়া হয়েছে, সেখানে এখনো কোনো স্থাপনা নির্মাণ হয়নি। বনভূমি সংরক্ষণ ও উপকূলীয় প্রতিবেশ রক্ষার স্বার্থে জমিটি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হলে তা দেশ ও পরিবেশ- উভয়ের জন্যই ইতিবাচক হবে।