তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিএনপি-জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দল একমত প্রকাশ করেছে। তবে এর গঠনপ্রক্রিয়া ও সময়সীমা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে দলগুলোর।
গতকাল বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অষ্টম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ সময় কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো: এমদাদুল হক, সফর রাজ হোসেন, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো: আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
কমিশন সভা শেষে বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আজকে আলোচ্যসূচিতে তিনটি বিষয় ছিল- নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়। এর মধ্যে আমরা প্রথম দু’টি বিষয় আলোচনা করতে পেরেছি। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অভিন্ন মত পোষণ করে এবং এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য আছে। আজকের বৈঠকে এর (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা) গঠন ও কাঠামো এবং এখতিয়ার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কাছাকাছি এসেছে।
আলী রীয়াজ জানান, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণবিষয়ে আশু এবং দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আশু ব্যবস্থা হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় যথাযথ দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে নিয়ে একটি বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা হবে বা যদি ইতোমধ্যে তা গঠিত হয়ে থাকে তবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা হবে এবং সেই কমিটির পরামর্শক্রমে সংসদীয় এলাকা নির্ধারণ করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে কমিশনের সহসভাপতি জানান, প্রতি আদমশুমারি বা অনধিক ১০ বছর পরে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯ এর দফা ১ এর (গ) এর শেষে উল্লিখিত ‘এবং’ শব্দটির পর ‘আইনের দ্বারা নির্ধারিত একটি বিশেষায়িত কমিটি গঠনের বিধান’ যুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট জাতীয় সংসদের সীমানা নির্ধারণ আইন ২০২১, যা ২০২৫ সালে সংশোধিত হয়েছে, তার ৮(৩) সাথে যুক্ত করে ওই কমিটির গঠন ও কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হবে।
সংলাপ শুরুর আগে সূচনা বক্তব্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা অগ্রসর হই। কখনো কখনো আমরা যতটা অগ্রসর হতে চাই, ততটা না পারায় খানিকটা হতাশ হই। কিন্তু তার পরও আমরা চেষ্টা করলে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ই একটা সনদের জায়গায় যেতে পারব। এটা আপনাদের সবার প্রচেষ্টা, সবার আন্তরিক সহযোগিতাটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘এক বছর আগে যখন আমরা সবাই মিলে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল, দলের ঊর্ধ্বে উঠে সব রকম বাধাবিঘœকে মোকাবেলা করে রাজপথে নেমেছিলাম। যে অর্জন আমরা করতে চেয়েছি একটি পর্যায়ে অতিক্রম করে আজকে এক বছর পর সমবেত হয়েছি।’
রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের চেষ্টা ‘যেন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত হয়। যেন জীবনের অধিকার সুরক্ষিত হয়। যেন গুম, হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিচারিক হত্যার শিকার না হয়।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘এটা আপনাদের কর্মীদের (রাজনৈতিক দল) অবদান, নাগরিকদের অবদান, সব রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্য শুধুমাত্র এক পর্যায়ে থেমে গেলে হবে না। তাকে সুরক্ষিত করতে হবে এবং সেই সুরক্ষার উপায় আমরা যেন সংস্কারের কার্যক্রমে এগিয়ে যেতে পারি।’ সেই চেষ্টায় রাজনৈতিক দলগুলো সহযোগিতা করছে বলে জানান তিনি।
সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা দলগতভাবে, জোটগতভাবে ব্যক্তিগতভাবে গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় আমরা চেষ্টা করে লক্ষ্য করেছি কমিশনের সাথে আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছে যেগুলো আমাদেরকে আশাবাদী করছে। আমরা মনে করি যে এই জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারব। কারণ আমাদের সবারই আন্তরিক প্রচেষ্টাটা আছে।’
সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সংবিধানে ফের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ সব দল ঐকমত্য পোষণ করলেও এই সরকারের প্রধান কে হবেন, কাদের নিয়ে কিভাবে গঠিত হবে এবং এর সময়সীমা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই স্থানীয় নির্বাচন চায় জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি দল। তবে এতে বিরোধিতা রয়েছে বিএনপির।
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদের ক্ষেত্রে বিএনপি প্রস্তাব দিয়েছে, তিন মাস বা ৯০ দিন। যদি কোনো কারণে বিলম্বিত হয়, আরো এক মাসের একটা বিধান রাখা যেতে পারে সংবিধানে। তবে স্থির থাকতে হবে তিন মাসে, এখানে আমরা আমাদের মতামত দিয়েছি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে তো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নেই। নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে দুইটা জিনিস- একটি হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন, আরেকটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেটা এখনো বহাল আছে। তাতে কোনো সংশোধন আসেনি। প্রস্তাব তো যে কেউ দিতেই পারে।
বিএনপি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা তো অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি। কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বলা হয় বিএনপির কারণে সংস্কারে ঐকমত্য হচ্ছে না। জাতির সাথে একটা ঐকমত্যে আসার জন্য নিজ উদ্যোগে আমরা প্রধানমন্ত্রীর জীবদ্দশায় ১০ বছরের বেশি নয়, এ বিষয়ে একমত হয়েছি। যাতে আর কেউ স্বৈরাচার হয়ে না আসতে পারে। একটা ব্যালেন্স যাতে সরকার ব্যবস্থায় হয়। আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানান তিনি।
এ দিকে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনা শেষে দলটির নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ১৯৮২ সালে অরিজিনালি বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাব ছিল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তৎকালীন জামায়াতের আমির আব্বাস আলী খান সাহেব সাংবাদিক সম্মেলন করে এ প্রস্তাব দেন। এটা উপনীত করেছিলেন আমাদের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম মহোদয়। আজকে সবাই আমরা এ বিষয়ে একমত হয়েছি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে কোনো অবস্থায়ই দায়িত্ব দেয়ার পক্ষে নয় দলটি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি প্রেসিডেন্টকে জড়ালে আমাদের আগের একটি অভিজ্ঞতা আছে। সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছি না। অবসরপ্রাপ্ত সর্বশেষ প্রধান বিচারপতিকেই চান ডা: তাহের। এটা না হলে আগের প্রধান বিচারপতি বা সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতিকে নিয়োগের বিষয়ে মত দেন।
জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে যেমন জাতীয় কোনো নির্বাচন হয় না। তেমনি দলীয় সরকার অধীনে একইভাবে কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন, নির্বাচন হয় না। দুটোই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে, এটা আমাদের দাবি।
‘পিআর (সংখানুপাতিক) পদ্ধতিতে নির্বাচন’ নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রসঙ্গে জামায়াতের অন্যতম এই নীতি নির্ধারক বলেন, আমরা মনে করছি, উনি (তারেক রহমান) যে বক্তব্য রেখেছেন, সেটি উনার মত। আমরা মনে করি, এটাই সবচেয়ে বেশি উপযোগী। সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্বপূর্ণ হবে এবং ফ্যাসিস্ট শক্তি কমে যাবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য জাবেদ রাসিম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ রেখা তুলে ধরে বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেখানে বিচারালয়কে টেনে এনে বিচারালয়কে রাজনীতিকীকরণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, আমরা এটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমেই এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। উচ্চ কক্ষ ও নি¤œ কক্ষের একটি ১১ সদস্যের পার্লামেন্টারি অল পার্টি কমিটির মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে তিনজন করে নাম প্রস্তাব করবে যিনি প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন। ওই নামগুলো পাবলিক হবে ওই খান থেকে যিনি পাস করে যাবেন, ১১ জনের কমিটি থেকে ভোটের মধ্যে যদি আট/তিন ভোটে পাস করেন তিনি প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হবেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে গতকালের বৈঠকে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার আবার কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।



