মনির হোসেন
ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গণতন্ত্রের মানসকন্যা, আপসহীন নেত্রী এবং সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পুরনো ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন কক্ষে বেশির ভাগ সময় কেটেছিল মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে। বন্দী জীবনে তাকে থাকার কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট দেয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের কষ্টই দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত কারা কর্মকর্তাদেরকে দিয়ে। তারপরও তিনি দমে যাননি। নীরবে সব কিছুই সহ্য করেছিলেন সেদিন।
কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাগারে তিনি যতদিন ছিলেন কখনো কারা কর্তৃপক্ষের দেয়া খাবার গ্রহণ করা ছাড়া বাড়তি কোনো চাহিদা করতেন না। তিনি সবসময়ই আইনের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারেই শুধু নয়, তার প্রথমবার কারাজীবন ১/১১ এর সময়ও তিনি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো দিন বাড়তি সুযোগ-সুবিধা চাননি। এরমধ্যে এক দিন সেনাবাহিনীর দু’জন অফিসার গোপনে তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেদিন তাদের সাথে কথা বলার একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া কড়া ভাষায় রাগ করেই তাদেরকে বলেছিলেন, আপনারা কি চান, আমি দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে ব্যক্তি স্বার্থ দেখব? এটা কোনো দিনও হবে না। যান, এখান থেকে আপনারা চলে যান।
এমন অসংখ্য স্মৃতিচারণমূলক ঘটনা কারা কর্মকর্তারা খালেদা জিয়ার কারাবন্দী থাকার সময় নিজ চোখে দেখতে পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ওই সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে লাইভ সাপোর্টে থাকা বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই মৃত্যুর সংবাদ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। এ সময় অনেকেই তার কারাজীবনের দিনগুলো কিভাবে কেটেছিল সেগুলো নিয়েও অনেকে অনেকভাবে স্মৃতিচারণ করতে শুরু করেন। এসব ঘটনার যিনি প্রত্যক্ষদর্শী সেই সময়ের কারাগারের ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব:) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী নয়া দিগন্তের পাঠকদের জানিয়েছেন কারাজীবনের কিছু অজানা তথ্য।
মেজর সামছুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, আমার দেখা মতে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন ১০০% খাঁটি দেশপ্রেমিক নেত্রী। আমি তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানাচ্ছি। মেজর হায়দার বেগম খালেদা জিয়ার ১/১১ এর সময়ের সংসদ ভবনের পাশের সাব জেলে আটক থাকার দিনগুলোর কিছু স্মৃতিচারণ করে নয়া দিগন্তকে বলেন, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মা তৈয়্যবা মজুমদার সম্ভবত ২০০৭ কি ২০০৮ সালে মারা গিয়েছিলেন। তখন সাব জেলে খালেদা জিয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনাও ছিলেন। আর পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো আটক ছিলেন। তৈয়্যবা মজুমদারে মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বেগম জিয়া ও তার দুই পুত্রকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারাগার থেকে তাদের মুক্তি দেয়ার সময় নির্ধারণ ছিল বেলা ১১টায়। কিন্তু দুপুর ১২টা, বেলা ১টা, দেড়টা বাজলেও তাকে মুক্তি দিচ্ছিল না সরকার। এ সময় তিনি খুব রাগ করে আমাকে বলছিলেন, ডিআইজি সাব আমারে যাইতে দিলে যাইতে দেন, নয়তো আমি কিন্তু হেটেই এখন রওনা দেবো। তখন আমি ম্যাডামকে বলেছিলাম, ঠিক আছে ম্যাডাম আপনি এখনই রওনা দিয়ে দেন! তখন জেলসুপার ছিলেন ফারুক সাহেব। একই সময়ে দুইশত বছরের পুরান ঢাকার কারাগারের কারা হাসপাতালে একাকী বন্দী ছিলেন তারেক রহমান। তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোও একই কারাগারের ৬ নম্বর সেলে ছিলেন। পরে তাদের তিনজনকেই একে একে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। একদিন কারাগারে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাহেব খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া খালেদা জিয়ার কাছ থেকে গোপনে একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে নিয়েছিলেন। এটি জেল সুপার ফারুক সাব দেখে ফেলেছিলেন। বিষয়টি ম্যাডামকে জানালে তিনি তাকে বলেছিলেন, এটা ঠিক হয়নি। এরপর তিনি আবার আমাদের কারা কর্মকর্তার সামনে আবার সই করেছিলেন। এ সময় ম্যাডাম আমাদেরকে বলেছিলেন, আমরা জাতীয়তাবাদী শক্তি। আমাদের দিয়ে আপনাদের বা দেশের কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। মেজর সামছুল হায়দার বলেন, ১/১১ এর সময় সাব জেলে একটি বড় ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ২০০৭ সালের দিকে। একদিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন গোপনে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এরপর তাদের মধ্যে কি কথা হলো সেটি আর আমি শুনতে পারিনি। তাদের কথার মধ্যে হঠাৎ দেখলাম, খালেদা জিয়া খুব রাগ করে তাদের বলছেন, দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে আমি কি নিজের স্বার্থ দেখব? এটা আমার পক্ষে কোনো দিনও সম্ভব না। পরে তারা সেখান থেকে চলে যান। তিনি আপসহীন নেত্রী ছিলেন বিধায় এভাবেই ওই সময় আর্মি অফিসারদের সাথে জোরগলায় কথা বলেছিলেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার দেখা মতে, তার ব্যক্তিগত কোনো লোভলালসা ছিল না। তিনি ছিলেন শতভাগ দেশপ্রেমিক নেতা। বেগম খালেদা জিয়া যেদিন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন সেদিন আমাদেরকে শুধু বলে গিয়েছিলেন, আপনারা সবাই ভালোভাবে ডিউটি করবেন। কোনো দিনও তিনি কারাবিধির বাইরে আমাদের কাছে ভালো থাকা এবং খাবার দেয়ার কথা বলেননি। সরকার তার জন্য যেটি বরাদ্দ রেখেছিল সেটিই তিনি খেয়েছিলেন। তবে শুনেছি পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে যখন তাকে বন্দী রাখা হয়েছিল তখন তিনি একাকী ডে কেয়ার সেন্টারে ছিলেন। সেখানে তিনি চাপের মধ্যে ছিলেন। ওই কারাগারে প্রথম যেদিন তাকে নেয়া হয়েছিল সেদিন সিনিয়র জেল সুপার তৌহিদুল ইসলামের কক্ষে তাকে প্রথম রাখা হয়েছিল। একরাত রাখার পর তাকে ডে কেয়ার সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। পুরো কারাগারে একমাত্র বন্দী ছিলেন তিনিই। সেখানে তিনি অসুস্থ হলেও ওই সময়ের কারা কর্তৃপক্ষ তাকে বাইরের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করেননি বলেও কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে মোট পাঁচবার আটক হয়েছেন। এরমধ্যে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনবার, ২০০৭ সালে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের শাসনামলে একবার এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে একবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন খালেদা জিয়া।



