দ্য হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, মায়ের সাথে ঈদ করেছেন জয়। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ঈদুল আজহার আগেই ভারতে এসেছিলেন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সূত্রও নিশ্চিত করেছে, জয় মায়ের সাথেই ঈদ কাটিয়েছেন। কার্যত দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা এখন নিজেদের অনেকটাই সংহত করে এনে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ, ফেসবুকের মাধ্যমে কর্মসূচি, ভারতে বৈঠকের পর বৈঠক করতে সমর্থ হচ্ছেন তারা। একের পর এক শেখ হাসিনার বক্তব্য আসছে ইন্টারনেটে। তবে তা কতটা নির্ভরযোগ্য এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে আদালতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হাসিনার বক্তব্য উল্লেখ না করেও এটি স্পষ্ট বলা যায় পুরনো সেই বিভীষিকাময় রাজনীতিতেই ফিরে আসতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ। সম্প্রতি ভারত থেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তিনি বাংলাদেশে থেকেই তিন মাসের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা, বিক্ষোভ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। নেত্রী তাকে তার স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিয়ে আন্দোলনে সবুজসঙ্কেত না দেয়ায় তিনি নাকি ভারত চলে যান। ওবায়দুল কাদেরের মতোই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ভারতীয় মিডিয়া দ্য ওয়ালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের মতো নতুন করে দেশ স্বাধীনের কথা বলেছেন। তার অডিওবার্তা ছড়িয়ে পড়ছে ইথারে। এর আগে সাবেক তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আরাফাত দ্য প্রিন্টকে বিশাল এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির আভাস দেন।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জয়ের ঘনিষ্ঠ মহল বলছেন, দিল্লি ও কলকাতায় পূর্বপরিকল্পনা মতো ফের তার সফরটি এ মাসের শেষ দিকে হতে পারে। জয়ের সফরসঙ্গীর কথায়, ‘আমরা আজই ফিরে এসেছি। টেকনিক্যাল কিছু বিষয়ের জন্য এই সফর নিয়ে কিছুই বলা যাবে না।’ তবে এ মাসের শেষ দিকেই আবার দেখা হবে বলে জানাচ্ছেন তিনি। সেটা হবে সরকারি সফর। সজীব ওয়াজেদের এই সফর ও শেখ হাসিনার অবস্থান নতুন করে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শেখ হাসিনার পরিবার বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ঈদুল আজহায় আমেরিকার ভার্জিনিয়া থেকে দিল্লিতে এসে শেখ হাসিনার সাথে সময় কাটিয়ে পরদিনই ফিরে গেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। ঈদের আগে শুক্রবার রাতে এক সঙ্গীকে নিয়ে দিল্লিতে পৌঁছান জয়। জয়ের সফরসঙ্গী তার আগামী সফরকে সরকারি সফর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাসিনার নেতৃত্বে তাহলে ভারতে কি আওয়ামী লীগ অঘোষিত প্রবাসী সরকার গঠন করে ফেলেছে এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে।
আওয়ামী লীগ কি রাজনৈতিক দল : লন্ডনে এ প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি প্রশ্ন করেন কোনো রাজনৈতিক দল কি মানুষ হত্যায় নেতৃত্ব দিতে পারে। আওয়ামী লীগ নেতারা বিদেশে পালিয়ে যেয়ে দেশের বিরুদ্ধে একই ধরনের ষড়যন্ত্র করছেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি বরং গুম, খুন, লুটপাট, বিদেশে টাকা পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান ইউনূস। এক সময় ভোটের অধিকার আদায়ে রাজনীতি করে হাসিনা বলেছিলেন আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। সেই রাজনীতি আর ভোটের অধিকার দুই সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেছেন শেখ হাসিনা স্রেফ ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার জন্য। ভারত তাকে সমর্থন জুগিয়েছে সর্বতোভাবে। এজন্য হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে রাজপথে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে পিছপা হননি হাসিনা। ভিনদেশের সেনারা এ হত্যাকাণ্ডে রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে জড়িত ছিল কি না তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যাচাই করছে।
জানা যায়, সরকার পতনের আগেই আত্মীয়স্বজনদের বিশেষ বার্তা দেন শেখ হাসিনা। শেখ পরিবারের সাথে সম্পর্ক রয়েছে এমন এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে সেই দিন গভীর রাতে ঘুমিয়েছিলেন তিনি। ঘুম যখন ভাঙল তখনো সূর্য ওঠেনি। বিছানায় মাথার কাছে থাকা মোবাইল হাতে নিতেই চোখে পড়ল হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজটি। একটা ছোট বাক্য। ‘নো ওয়ান স্টে হিয়ার’। এক লাইনের এই টেক্সট মেসেজের প্রেরক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুঝতে তার কোনো অসুবিধা হলো না শেখ হাসিনার এই বার্তার অর্থ। চার শব্দের এই মেসেজটি ছিল তার সর্বশেষ নির্দেশ। তিনি দ্রুতই দেশ ছাড়তে বলছেন। আগের দিন, ৩ আগস্ট পারিবারিক মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজনদের একই বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার নিজেই মোবাইলে টেক্সট করে সেই নির্দেশ দিলেন স্বজনদের। শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছে নয় বিপাকে পড়া অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর কাছে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খায় যেকোনো রাজনৈতিক দলের নেত্রী কি তার নেতাকর্মীদের বিপদের দিনে পাশে না থেকে স্বজনকে নিয়ে নিরাপদে সরে যেতে পারেন। তাদের কাছে হাসিনার সেই বাক্য, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’ এখন তীব্র কশাঘাত আর অন্যদের কাছে হাস্যরসের উদ্রেক করে।
ভারতে বসে কিভাবে রাজনীতি করছে আ’লীগ : শুধু বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন নয়। একাধিক ভারতীয় মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা। ডয়েচে ভ্যালে, দি প্রিন্টসহ বিভিন্ন মিডিয়া বেশ গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য প্রকাশ করছে। এসব বক্তব্যের অংশবিশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইউটিউবে এসব বক্তব্য নিয়ে কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। প্রচারমাধ্যমে এভাবে স্থান নিতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দেশে থাকা কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য গত ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে নানা কর্মসূচির ঘোষণা দেয় আওয়ামী শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু সেই ঘোষণায় কোনো সাড়া মেলেনি। সাড়া দিচ্ছেন না মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তারা তো চোখের সামনে মরতে দেখেছেন স্বজনদের, হোক না তারা অন্যদলের সমর্থক। একই আওয়ামী পরিবারের সদস্য অন্য দল করায় বিক্ষোভ প্রতিবাদে অংশ নিতে যেয়ে শহীদ হয়েছেন। এমন শহীদের তালিকায় আওয়ামী নেতার সন্তানও রয়েছে। তাদের সাথে পলাতক আওয়ামী নেতাদের এক বিরাট ফারাক তৈরি হয়েছে। যারা দেশে আছেন তারা দেশের মাটিতে দেশের মানুষের সাথে মিলে মিশে থাকতে চাচ্ছেন।
অন্য দিকে ভারতে বসেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের একটা বড় অংশ। তাদের এই ‘সাময়িকভাবে আত্মগোপনে’ থাকা মেনে নিতে পারছেন না দেশে থাকা আওয়ামী নেতাকর্মীরা। অন্যায় করলে জুলুম করলে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সাহস যাদের নেই তাদেরকে ভারতে বসেই দল চালানোর চেষ্টা চালাতে হচ্ছে। কতজন আওয়ামী লীগ নেতা ভারতে রয়েছেন? কিভাবে তারা যোগাযোগ করছেন নিজেদের মধ্যে? কে কোথায় আছেন? এটা এখন একটা ‘ওপেন সিক্রেট’ মানে সবারই জানা অথচ কেউ তা খোলাখুলি বলেন না। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম জানান, পালিয়ে নয়, কৌশলগত কারণে তারা সাময়িকভাবে আত্মগোপনে আছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া বাসা ভাড়া নিয়ে অনেক নেতাই কলকাতা, উত্তরবঙ্গ, দিল্লি, ত্রিপুরায় আছেন। দলটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্তত ২০০ জন পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে সাবেক সরকারের শীর্ষ পদাধিকারী, মন্ত্রীরা এবং অন্তত ৭০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। তবে ইউরোপসহ আরো কয়েকটি দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে ভারতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক হচ্ছে অ্যাপে।
দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা, পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের অনেক জেলা সভাপতি-সম্পাদক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মেয়র এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। তারা যোগাযোগ রাখছেন দেশে তাদের সমপক্ষদের সাথে। হতাশা থেকে চাঙ্গা করে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। তাদের বলা হচ্ছে নিরুপায় হয়ে ভারতে আসতে বাধ্য হয়েছেন হাসিনা। একটা চক্রান্তকারী, অশুভ শক্তি তাকে ভারতে যেতে বাধ্য করে। আবার ভারতই আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বন্ধুরাষ্ট্র। খুব কম সময়ে আমাদের দেশ থেকে এখানে এসে বসবাস করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও লাখো মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। ভারত অনেক দিন সেসব মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। সে জন্য রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ ছাড়তে হলে ভারতই প্রথম পছন্দ। আপা আসবেন। আপা ফিরে আসার রাজনৈতিক পরিবেশ আপনাদেরকেই তৈরি করতে হবে। মাঠে নামুন ইত্যাদি।
হাসিনার সাথে কিভাবে যোগাযোগ করেন নেতারা?
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সাথে হাসিনার নিয়মিত যোগাযোগ হয় অ্যাপের মাধ্যমে। তবে শেখ হাসিনার সাথে কেউ দেখা করতে পেরেছেন কি না, সেটা তারা জানাননি। অ্যাপসের মাধ্যমে হাসিনাকে মেসেজ দিয়ে রাখলে তিনি সুবিধামতো উত্তর দেন। আবার বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন হাসিনা। ভারত এবং অন্য দেশে যেসব নেতা পালিয়ে গেছেন, তারা সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাদের যারা কলকাতা বা তার আশপাশে আছেন তাদের মধ্যে নিয়মিতই দেখা সাক্ষাৎ হয়। আত্মগোপনে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ বলেন, হতে পারে আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডে আছি, ডিজিটাল মাধ্যমেই কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হচ্ছি। আমরা ফেসবুকের মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা করছি।
নেতৃত্ব হাতছাড়া করতে চান না হাসিনা : আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব বদলের কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। কারণ আওয়ামী লীগ নেতারা যা কিছু করেছেন তা দেশের জন্যই করেছেন এমন বিশ্বাসে দেশে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনে চিড় ধরলেও ফের দেশে চট করে ফিরে ক্ষমতায় বসবেন হাসিনা তা অনেকে এখনো বিশ্বাস করেন। হাসিনা পদত্যাগ করেননি। তার পদত্যাগপত্র কোথায়, রাষ্ট্রপতির কাছে? এমন প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু মানুষের প্রশ্ন আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় আসলে আয়নাঘর চালু হবে কি না। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সফট পাওয়ার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সুযোগ বুঝে সক্রিয় হয়ে উঠবে। এমন নির্দেশনা এসেছে ভারত থেকে। এখন সিপিবি ও বাম ঘরানার রাজনৈতিক প্রক্সি চলছে আওয়ামী লীগের পক্ষে।
খালেদার টার্নিং পয়েন্টে বড় ক্ষতি আওয়ামী লীগের : নির্বাচন ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সমঝোতার পথে হাঁটুন, বিরোধ নয়, বেগম খালেদা জিয়ার এমন পরামর্শ হতবাক করে দিয়েছে খোদ কিছু বিএনপি নেতাকে। এসব নেতার কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারকে ২৪ ঘণ্টায় ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। লন্ডন থেকে আলটিমেটাম চলে আসে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন দিতে হবে। কিন্তু আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের সাথে কোনো ধরনের বিরোধে না জড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করার পরামর্শ দিয়ে বসেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে বেগম জিয়া পাল্টা প্রশ্ন তোলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে আমাদের বিরোধ কী নিয়ে? তারা কি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি? বেগম জিয়ার এই অনড় অবস্থানে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির শঙ্কা তৈরি হয়েছিল তা দূর হয়ে গেল। এ ধরনের অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে পুরো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতো আওয়ামী লীগ। ইউনূস ব্যর্থ বলে চট করে দেশে ফিরে আসার একটা আভাস অন্তত পেতেন হাসিনা। কিন্তু বেগম জিয়ার এ ধরনের রাজনৈতিক উপলব্ধির অনুপস্থিতি বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ছিল কিভাবে। কেন বেগম জিয়াকে পরামর্শ দিতে হচ্ছে- নির্বাচন তারিখ ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিএনপির বিরোধে যাওয়া ঠিক হবে না। কোনো সমস্যা থাকলে সেটা সরকারের সাথে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে। তা ছাড়া ইতোমধ্যে ড. ইউনূসের সাথে বিএনপির যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে সেটা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করে নিতেও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাহলে কি ভারতের প্ররোচনায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা খাবি খাচ্ছিলেন এমন আলোচনা রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
তবুও লন্ডনে গেলেন আমীর খসরু : ১৩ জুন (আজ) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠকে বসছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। খুবই স্বাভাবিক এ বৈঠকে আগামী নির্বাচনের তারিখের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাথে বিএনপির যেসব বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও কথা হবে। সাম্প্রতিকালে চট্টগ্রাম বন্দর, মিয়ানমার সীমান্তে করিডোর দেয়া নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে, বৈঠকে সে বিষয়গুলো উত্থাপিত হতে পারে। সময় থাকলে আলোচনা হতে পারে। বৈঠককে কেন্দ্র করে লন্ডন গেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ভারতের বিজেপি নেতা অমিত শাহের সাথে দেখা করেছিলেন আমীর খসরু। বিএনপির কাছে ভারতীয় শাসকদের কী কী চাওয়া হতে পারে তার কিঞ্চিৎ বর্ণনা ইতোমধ্যে দিয়েছেন আমীর খসরু। বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর তো বলেই দিয়েছেন ভারতের সাথে তার দল কোনো শত্রুতায় জড়াতে চায় না। ইউনূসের সাথে বৈঠকের আগেই তারেক জিয়াকে কি কোনো শলাপরামর্শ দিতে লন্ডনে গেলেন আমীর খসরু এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক হাওয়ায়। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগোচ্ছেন ইউনূস তা থেকে বিরত থাকতে ভারতীয় চাপের কথা কি বলবেন আমীর খসরু। যদিও মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বর্তমানে যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা অবস্থান, তাতে এটা একটা বড় ইভেন্ট, গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। অনুষ্ঠেয় বৈঠকটিকে এ সময়ের বড় ‘পলিটিক্যাল ইভেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, অনেক সুযোগ তৈরি হতে পারে এ বৈঠকে। অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। অনেক কিছু সহজ হয়ে যেতে পারে। নতুন ডাইমেনশন তৈরি হতে পারে এ বৈঠকে। নতুন একটা দিগন্তের উন্মোচন হতে পারে। তাহলে মির্জা ফখরুলরা এত দিন এসব সুযোগ কেন কাজে লাগাননি? তারা তো দেশেই ছিলেন, ইউনূসও দেশে ছিলেন। তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছিল!
আবারো ইউনূসের মাজেজা : লন্ডনে ভারত ও চীনের সাথে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এখন পরিস্থিতি একটু বদলেছে, আমরা এখন সবাইকে কাছে টানছি।’ এখানেই কি রাজনীতিবিদদের বিপত্তি? তারা কি বুঝতে পারছেন ইউনূস বাংলাদেশের ব্যাপারে সারা বিশ্বকে তার অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপগুলোর প্রতি সম্মতি আদায় করতে সমর্থ হয়েছেন। এজন্যই কি ইঊনূসের সাথে তারেক জিয়ার আলোচনাকে এতটা গুরুত্ব দিতে শুরু করছেন বিএনপি নেতারা? তারা কি এজন্য এতদিনের রাজনৈতিক কিবলা পরিবর্তন করছেন? ইউনূস কোনো রাখঢাক না রেখে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। বলেছেন ‘বিশাল দেনার চাপায় অর্থনীতি’র কথা। ‘এটাই আসলে আমাদের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় আছে, তখন আমাদের দেশের অর্থনীতি ‘শূন্য’ না, বরং শূন্যেরও নিচে। বিশাল পরিমাণ দেনা রয়েছে। আগের সরকার ঘুষ খাওয়ার জন্য যেসব মেগা প্রকল্প নিয়েছিল সেগুলো পরিশোধের সময় এসেছে। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো অর্থ নেই। ব্যাংক, নন-ব্যাংক সব উৎস থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বের করে ফেলা হয়েছে বলে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে এসেছে। এটা নথিভুক্ত প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে একটি গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে নানা কায়দায় অর্থ বের করে নিয়েছে। ‘বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ শেষ। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। পদ্ধতিটা ছিল খুব সহজ ও পর্ষদকে (ব্যাংকের পরিচালকদের) হুমকি দিয়ে পদত্যাগ করানো, নিজের লোক বসানো, তারপর বন্ধুবান্ধবদের ঋণ দেয়া হয় কোনো জামানত ছাড়াই। আর বলেই দেয়া হত, ‘ফেরত দিতে হবে না।’ এই অবস্থা থেকে আমরা শুরু করেছি। এখন আমাদের বিলগুলো মেটাতে হচ্ছে, না হলে আদালতে মামলা হবে যেটা আমাদের জন্য ভালো না। অর্থনীতির চরম এই সঙ্কট থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বাঁচিয়েছেন। এখন ব্যালান্স অব পেমেন্ট পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বৈশ্বিক সমর্থন আমাদের পক্ষে। সব দেশের কাছ থেকে আমরা আশ্চর্যজনক সহায়তা পেয়েছি। তারা বলেছে, অবশেষে একটা সরকার এসেছে যাদের সাথে কাজ করা যাবে। যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইউএস, জাপান, চীন সবাই বলেছে, ‘যা দরকার, বলো।’ ইতিহাস এখন আমাদের একটা জানালা খুলে দিয়েছে। আমরা যদি এখন না পারি, কোনো দিন পারব না। তাই এখনই সময় সিস্টেম বদলানোর, দুর্নীতিকে নির্মূল করার, একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার। আমরা এমন কিছু কাজ করতে পারি যা কোনো সরকার করতে পারে না, কারণ সব সরকার পক্ষপাতদুষ্ট, তাদের সমর্থক আছে। আমাদের কোনো সমর্থক নেই, কারো ভোটের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় না। নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব থেকে আমরা যাচ্ছি এটা একদম স্পষ্ট। তাই আমাদের কাছে নৈতিক শক্তি আছে, আমরা একটা অন্তর্বর্তী সরকার এবং পুরোপুরি শক্তিশালী।
তবুও অলিগার্করা এখনো সক্রিয় : এস আলম থেকে শুরু করে অনেক অলিগার্ক ফের রাজনীতিবিদদের পেছনে অর্থ ঢালতে শুরু করেছেন আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে। কার্যকর সংসদ যাতে গড়ে না ওঠে, তাদের লুটেরা বশংবদ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা যাতে নির্বাচনে কালো টাকা ছড়িয়ে সংসদে ঢুকে পড়তে পারে সেই প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। ‘সংস্কার নিপাত যাক, নির্বাচন শীঘ্রম’ এই বুলি তারা রাজনীতিবিদদের শিখিয়ে দিয়েছেন অত্যন্ত সফলতার সাথে। তাদের অফিসে বসতে শুরু করেছেন রাজনীতিবিদদের ছেলেপুলেরা। আগামীর সংসদ সদস্য। কারাগারে থেকেই ‘দরবেশ বাবা’ লন্ডনে যোগাযোগ করেছেন প্রখ্যাত এক প্রবাসী সাংবাদিকের মাধ্যমে। উদ্দেশ্য, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের ধস ঠেকানো। রাজনৈতিক গুঞ্জন চলছে এসব নিয়ে। এর কোনো প্রমাণিত সত্য নেই। তবুও মানুষ বলে ‘যা রটে তা কিছুটা তো বটে।’



