রাজনৈতিক পরিবর্তনেও বদলায়নি আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি

পুরনোকে পাশ কাটিয়ে নতুন আঙ্গিকে সৃষ্টি হচ্ছে অপরাধমূলক কার্মকাণ্ড। মাঠ গুছিয়ে আধিপত্য বিস্তার করছে জেল ও দেশের বাইরে থাকা সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ছেড়ে যাওয়া চাঁদাবাজির জায়গাগুলো দখল নিয়েছে নতুন মুখ। একের পর এক ঘটছে খুন, ছিনতাই, চুরি ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দুর্বল পুলিশিং ব্যবস্থা।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition
  • কমছে না খুন চাঁদাবাজি ছিনতাই

  • তফসিলের পর ১৪৪ সহিংস ঘটনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক বড় পরিবর্তন ঘটলেও বদলেনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। পুরনোকে পাশ কাটিয়ে নতুন আঙ্গিকে সৃষ্টি হচ্ছে অপরাধমূলক কার্মকাণ্ড। মাঠ গুছিয়ে আধিপত্য বিস্তার করছে জেল ও দেশের বাইরে থাকা সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ছেড়ে যাওয়া চাঁদাবাজির জায়গাগুলো দখল নিয়েছে নতুন মুখ। একের পর এক ঘটছে খুন, ছিনতাই, চুরি ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দুর্বল পুলিশিং ব্যবস্থা।

এরই মাঝে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম। নির্বাচনী প্রচারণা নিয়েও একের পর এক ঘটছে সহিংস ঘটনা। অনেকেই মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার কারণে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মতে, বিগত সরকারের সময়ে পুলিশের কিছু সদস্য নিজেরাই সন্ত্রাসীদের মতো ভূমিকা পালন করে ত্রাস সৃষ্টি করতেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই পুলিশের উপর আসা বড় ধরনের আঘাত মনোবল ভেঙে দিয়েছে এই বাহিনীর সদস্যদের, যার কারণে পূর্ণ সাহস ও উদ্যম নিয়ে কাজ করতে সাহস পাচ্ছেন না তারা।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে ১৪৪টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে জামায়াত নেতাসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে আহত অন্তত ৫০০। গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। এ ছাড়া ভীতি দেখানো এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি। এর বাইরে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ছয়টি, প্রচার কাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ২৪টি।

শেরপুরের জামায়াত নেতা ছাড়াও অন্য তিনটি রাজনৈতিক হত্যার হিসাব দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। এর মধ্যে রয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনা। গত ১২ ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর পল্টন থানাধীন বক্সকালভার্ট রোডে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ছাড়া গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার হত্যা ও ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক মো: নজরুল ইসলাম হত্যার তথ্যও দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে কুমিল্লা জেলায়। গত ১৯ জানুয়ারি এ জেলার চৌদ্দগ্রাম থানা এলাকার সমেশপুর এবং তেলিপুকুর এলাকায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে এ ঘটনা কেন্দ্র করে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর পর ২০ জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার উজিরপুরে ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর উঠান বৈঠকে বিএনপি নেতাকর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের সাথে সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়। এ ঘটনায় কিছু চেয়ার এবং একটি গাড়ির সামনের গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়। এ সময় তিন-চারজন আহত হন। এ ঘটনার ঠিক দুই দিন পর ২২ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনা থানা এলাকার পুরনো বাসস্ট্যান্ড ওভারব্রিজের নিচে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এম এ মতিনের বহরে হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।

কুমিল্লার পর সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটেছে লক্ষ্মীপুরে। ১৫ জানুয়ারি এ জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার চরশাহী ইউনিয়নের সৈয়দপুর বটতলা এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নারীকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকোলেট বিতরণ করছিলেন। সেখানে গুজব রটানো হয় যে, নারী কর্মীরা ভোটারদের এনআইডি কার্ডের ছবি ও বিকাশ বা নগদ নম্বর সংগ্রহ করছেন। এমন গুজবের উপর ভিত্তি করে বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের উপর হামলা চালায়।

পরে স্থানীয় জামায়াতপন্থী নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এলে দুই পক্ষের মধ্যে বাগি¦তণ্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। লক্ষ্মীপুরের ওই ইউনিয়নেই পর দিন জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়। এর পর গত ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের সদর থানার রিফিউজি মার্কেট এলাকায় জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবির কর্মীদের লিফলেট দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মীদের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। ২৫ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপি সমর্থকরা বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়।

প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ২৫টি জেলা ও তিনটি মহানগরে। এর মধ্যে পাবনা জেলার সাঁথিয়া ও চাটমোহর, বগুড়ার নন্দীগ্রাম, ধুনট ও শিবগঞ্জ থানা; টাঙ্গাইলের সদর, বাসাইল ও গোপালপুর; কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, অষ্টগ্রাম ও সদর; ফরিদপুরের কোতোয়ালি ও ভাঙ্গা; লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার মিরপুর মডেল ও খিলক্ষেত থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী, পদ্মা সেতু (উত্তর) থানা; সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া; পটুয়াখালীর বাউফল ও গলাচিপা; ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও ভালুকা থানা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের পতেঙ্গা ও বন্দর থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে নওগাঁর নিয়ামতপুর ও রানীনগর, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর, নেত্রকোনার কেন্দুয়া, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ; রাজশাহী মেট্রোপলিটনের শাহ মখদুম, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, বরিশালের মুলাদী, গাইবান্ধার সাঘাটা, মেহেরপুরের সদর, বরিশালের মুলাদী, ফেনীর ছাগলনাইয়া, শরীয়তপুরের পালং এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানা এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা, মব সহিংসতা এবং হঠাৎ সংঘটিত ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। এর মধ্যেই সীমিত জনবল ও সম্পদের মধ্যেই পুলিশ নিয়মিত অভিযান, তদন্ত ও গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। তিনি পরিস্থিতি আরো উন্নত করতে জনসম্পৃক্ততা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান।

পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। কেউ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে তাকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পুলিশ সর্বাত্মক পেশাদারত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।