আলজাজিরা
চলতি বছর ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় দনিপ্রোপেত্রোভস্কের ৭৪৫ বর্গকিলোমিটার (২৮৭ বর্গমাইল) এলাকা পুনরুদ্ধার করে অভিযান সফলভাবে শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি জানান, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত এই অভিযানে প্রায় ১০ হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছে এবং ২৬টি লোকালয় মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণকারী ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ (আইএসডব্লিউ) তাদের মূল্যায়নে নিশ্চিত করেছে যে, ইউক্রেন ওই অঞ্চলে অন্তত ৬২৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আইএসডব্লিউর হিসাব মতে, পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক জয়ে পুতিনের আগ্রাসনের পরও চলতি বছর পুরো রণাঙ্গনে রাশিয়া নিট ২৩৩ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড হারিয়েছে।
অভিযানের পরিকল্পনাকারী সাবেক সেনাপ্রধান ওলেকসান্দর সিরস্কি বলেন, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী কেবল প্রতিরক্ষাতেই সক্ষম নয়, বরং আক্রমণ চালিয়ে ভূখণ্ড মুক্ত করতেও পারদর্শী। গত জুন ও জুলাইয়ে পোকরোভস্ক থেকে দোব্রোপিলিয়া এবং চাসিভ ইয়ার থেকে কোসত্যানতিনিভকার দিকে হামলা চালিয়ে রাশিয়া কিছু জমি দখল করতে পারলেও তাদের ভারী মূল্য দিতে হয়েছে। জুনে ৩৯ হাজার এবং জুলাইয়ে প্রায় ৪৩ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে দেশটির, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। ইউক্রেনের এই সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে স্বল্পপাল্লার ‘ফার্স্ট-পারসন ভিউ’ (এফপিভি) ড্রোন। বর্তমানে রাশিয়ার ১০টি ড্রোনের বিপরীতে ইউক্রেনের ১৬টি ড্রোন রয়েছে, যা জুন-জুলাইয়ে ৭০ শতাংশেরও বেশি রুশ প্রাণহানির কারণ। এ ছাড়া জুলাইয়ে তারা ৪০ হাজারের বেশি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের এই স্বস্তির মাঝে ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত ৮ ও ১১ আগস্ট কিভে এবং ৯ আগস্ট ওদেসায় ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ হামলায় ওদেসা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ১১ আগস্ট জাপোরিজিয়া শহরের হামলাসহ এসব হামলায় মোট ৯ জন নিহত হন। জেলেনস্কি জানান, ২০২৫ সালের তুলনায় মিত্রদের কাছ থেকে প্রায় তিন গুণ কম প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ায় তা ফুরিয়ে এসেছে।
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপপ্রধান ভাদিম স্কিবিটস্কি জানান, ইউক্রেন সহজে ভূপাতিত করতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বন্ধ করে রাশিয়া এখন ইসকান্দার-এম ব্যালিস্টিক ও এস-৪০০ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এস-৪০০-কে এখন ব্যালিস্টিক ট্রাজেক্টোরি অনুসরণের জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছে। রাশিয়ায় গত এপ্রিলে ৬১টি, মে মাসে ১০৭টি, জুনে ১৩৪টি এবং জুলাইয়ে রেকর্ড ১৯৮টি ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বর্তমানে মাসে ১০০টির বেশি এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে তারা। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ৫৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও শীতকালে ইউক্রেনের শক্তি অবকাঠামোয় বড় হামলার উদ্দেশ্যে মজুদ বাড়াচ্ছে মস্কো। গত শীতে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের শক্তি খাতের প্রায় সাত হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। ইউক্রেনের স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন সেন্টার জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসের আগেই কিভে বড় হামলার পরিকল্পনা থাকতে পারে রাশিয়ার। ইউক্রেনীয় সূত্রমতে, সীমান্তঘেঁষা ভোরোনেঝ অঞ্চলে উত্তর কোরিয়া ১২০টি পর্যন্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বাহিনী পাঠাচ্ছে। সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরোভ জানান, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী দলকে ধ্বংস করতে ইউক্রেনকে নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে ‘কাউন্টার-ব্যালিস্টিক যুদ্ধ’ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি রাশিয়া এখন সহজে আটকানো যায় না এমন জেট চালিত গেরান-৪ ও গেরান-৫ ড্রোন তৈরিতে নজর দিয়েছে এবং নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ‘রাসভেত’-এর ১৬টি স্যাটেলাইট চালু করেছে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে ২৯২টিতে উন্নীত করা হবে।


