পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা কমিয়ে এনে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী শাসনের অবৈধ আদেশ পালন করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জনরোষের শিকার হয়েছেন।’ পুলিশ জনগণের বন্ধু উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, পুলিশ বাহিনীকে সেই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫ উদ্বোধনকালে প্রধান উপদেষ্টা এ আহ্বান জানান। এ সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ড. ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে পুলিশ সদস্যদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মনে রাখবেন, কোনো ব্যক্তি যদি অন্যায় বা অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়, সেই ব্যক্তির দ্বারা ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সুতরাং কারো দ্বারা ব্যবহৃত হবেন না। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্রত হিসেবে নির্বাচনে নিজেদের নিয়োজিত করবেন। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে কখনই যেন পুলিশ বাহিনীকে দলীয় বাহিনী বা অন্যায় কাজে ব্যবহার না করা যায় সেজন্য একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের আগের এই সময়টা অনেক কঠিন। আপনাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, পরাজিত শক্তি যেন কোনোভাবেই দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে।’
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আমি আগেও বলেছি, আমরা একটা যুদ্ধাবস্থায় আছি। অশুভ চক্র আমাদের স্বপ্নকে, আমাদের ঐক্যকে ভেঙে দিতে সব শক্তি নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। একে প্রতিহত করার জন্য আপনাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা অনেক ন্যায্য, অন্যায্য আন্দোলনে মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে দেখেছি। এসব পরিস্থিতিতে আপনারা অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আশা করি একই রকম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে আগামী দিনগুলোতেও আপনারা কাজ করে যাবেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ মানুষের বন্ধু। পুলিশ বাহিনীকে সেই ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রথমবারের মতো এবার পুলিশ সপ্তাহে ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে আমি জানতে পেরেছি। এ বৈঠকে পুলিশের ওপর জনসাধারণের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা হবে। আমার প্রত্যাশা হলো, এটি যেন চলমান থাকে। প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহে যেন এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আজারবাইজানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ : আজারবাইজানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পাশাপাশি মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা ঢাকায় আজারবাইজানের একটি দূতাবাস খোলার এবং ঢাকা ও বাকুর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আজারবাইজানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলনুর মাম্মাদোভ প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা আজারবাইজানের সাথে বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচির আদান-প্রদান বাড়াতে সম্মতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য আজারবাইজান এখনো দূরের একটি দেশ। একটি সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে এবং আজারবাইজানের শিক্ষার্থীরাও বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত থেকে শিখতে আগ্রহী হবে। তিনি বলেন, ঢাকায় আজারবাইজানের দূতাবাস স্থাপন হলে ভিসাসংক্রান্ত জটিলতাও দূর হবে।
সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও আজারবাইজানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ওপর জোর দেয়া হয়। আলোচনার সময় প্রধান উপদেষ্টা গত নভেম্বরে বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ২৯ সম্মেলনের সাইডলাইনে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের সাথে তার বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। তিনি কপ২৯ সফলভাবে আয়োজনের জন্য আজারবাইজান সরকারকে অভিনন্দন জানান এবং প্রেসিডেন্ট আলিয়েভকে ধন্যবাদ জানানোর অনুরোধ জানান। যিনি তার সাথে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছেন। আজারবাইজানকে বিনিয়োগের পাশাপাশি মানবসম্পদ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা আজারবাইজানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাই। আমাদের প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যা রয়েছে, যার অর্ধেকই তরুণ। ফলে আপনি যদি কোনো শিল্প স্থাপন করেন, তাহলে কর্মীর অভাব হবে না।
আজারবাইজানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুই বছর পর বাংলাদেশ ও আজারবাইজানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৩৫তম বার্ষিকীকে সামনে রেখে তারা বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে চায়। তিনি বলেন, আমরা এখানে এসেছি সম্পর্ক আরো গভীর করতে। প্রধান উপদেষ্টাকে আজারবাইজানের আসান ও ডোসট মডেল সম্পর্কে অবহিত করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা আসান ও ডোসট সেবার ধারণাকে সাধুবাদ জানান এবং বাংলাদেশে এই মডেলগুলো অনুসরণের সম্ভাবনা অন্বেষণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলোচনার একপর্যায়ে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আজারবাইজানে অনুষ্ঠিতব্য ইকোনমিক কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ইসিও)-এর ১৭তম সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন।



