ডিসি সারওয়ার আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন, মাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে

সিলেট বিমানবন্দরে নেমেই মুখ খুললেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী

Printed Edition

আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট ব্যুরো

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বিদেশ সফর শেষে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই মুখ খুলেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: সারওয়ার আলমের সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘বিদায়ী ডিসি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। শাহজালাল (রহ:) দরগাহর হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’

গতকাল বুধবার বিকেল ৫টার দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সিলেটের একসময়ের জনপ্রিয় মেয়র ও বর্তমান প্রভাবশালী এই মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অস্বচ্ছতার সুযোগ দেয়া হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সিলেটের সর্বস্তরের অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) নিয়ে বসে আমরা এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবো এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলব।’

ডিসি সারওয়ার আলমের আকস্মিক বদলি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি একটি রুটিন ওয়ার্ক। ডিসি সাহেবের বদলি এই সময়ে হওয়াটা হয়তো কাকতালীয়। এটি আগেও হতে পারত, পরেও হতে পারত।’ তবে মাজারের দানবাক্স খোলা নিয়ে বিদায়ী ডিসির নেয়া পদক্ষেপের প্রতি মন্ত্রী তার পরোক্ষ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়ার পরপরই জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের প্রত্যাহার ও বদলি আদেশ জারি করা হয়। জনস্বার্থে জারিকৃত ওই আদেশে তাকে অবিলম্বে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। সিলেটে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মন্ত্রী দেশে থাকলে হয়তো ডিসির এই আকস্মিক বদলি হতো না। তবে বদলি আদেশের পর নিজের শেষ কর্মদিবসে এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তে সিলেটবাসীকে চমকে দেন ডিসি সারওয়ার আলম। গত ২১ জুন দরগাহ মাজারে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বসানো দানবাক্সগুলো প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে খুলে গণনা করা হয়। মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রকাশ্যে টাকা গণনার ঘটনা এটি। টাকা গণনাকালে প্রায় ১৮ লাখ টাকাসহ সোনা-গয়না ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যায়। এর সাথে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে আরো ৫ লাখ টাকা যুক্ত করে ২২ লক্ষাধিক টাকা ব্যাংকে মাজারের ফান্ডে জমা করা হয়। সূত্র জানায়, টাকা গণনাকালে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার বারবার ডিসিকে ফোন করে গণনা বন্ধ রেখে সার্কিট হাউজে চলে আসার নির্দেশ দেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা ডিসি কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে তার ঐতিহাসিক কাজটি সম্পন্ন করেন এবং সিলেটবাসীর বিপুল প্রশংসা কুড়ান। এ ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

আজ বিমানবন্দরে মন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা, জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বিএনপি মহানগর ও জেলার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফেসবুকে আবেগঘন বিদায়, ২০ হাজার মন্তব্য

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে বিমানযোগে সিলেট ত্যাগ করার মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি সংক্ষিপ্ত ও আবেগঘন পোস্ট দেন বিদায়ী ডিসি সারওয়ার আলম। তিনি লিখেন, ‘বিদায় সিলেট। ভালো থাকুন সিলেটবাসী। আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য।’

পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। গত দুই দিনে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এই পোস্টে লাইক দিয়েছেন, শেয়ার হয়েছে ১০ হাজারের বেশি এবং মন্তব্য করেছেন ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। মন্তব্যের ঘরে হাজার হাজার সিলেটবাসী তার বিদায় নিয়ে গভীর দুঃখ ও আকুতি প্রকাশ করেছেন।

দেশে-বিদেশে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

এ দিকে ডিসি সারওয়ার আলমকে সিলেটে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে। বদলির আদেশ জারির পর থেকে আজ বুধবার পর্যন্ত সিলেট, তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে প্রবাসী সিলেটবাসীদের উদ্যোগে ব্যাপক মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, একজন সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাকে এভাবে সরিয়ে দেয়া সিলেটের মানুষ মেনে নেবে না।