নয়া দিগন্ত ডেস্ক
অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। একই সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্য দেশগুলোকেও এ ধরনের পদপে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
কাতার, তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্দান, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। এতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদপে হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আট দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ইসরাইলি বসতি স্থাপন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। বসতি স্থাপন কার্যক্রমের সাথে জড়িত ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনারও আহ্বান জানান তারা।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই আট দেশের তালিকায় রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যে দেশ ২০২০ সালে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর তেল আবিবের সাথে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ফলে ইসরাইলি বসতি প্রশ্নে আবুধাবির এমন প্রকাশ্য অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত কূটনৈতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতারাও ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা এবং বসতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ল্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশও একই ধরনের পদপে নেয়া অথবা ইউরোপীয় পর্যায়ে এমন উদ্যোগকে সমর্থনের কথা জানিয়েছে।
আট মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এসব পদেেপর প্রতি সমর্থন জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করবে।
বসতি নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ
পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের বিষয়। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও বহু দেশ অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি ভূমি দখল এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
আট দেশের বিবৃতিতে ইসরাইলের প্রতি বসতি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধ করার পাশাপাশি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ও জনমিতিক চরিত্র পরিবর্তনের ল্েয নেয়া সব ব্যবস্থা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনি গ্রাম, কৃষিজমি ও সম্পত্তিতে হামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরে এসেছে। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি কর্তৃপরে ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়Ñএমন অভিযোগও রয়েছে।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর
যৌথ বিবৃতিতে আট মুসলিম দেশ গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনা দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে তারা পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ন্যায়সঙ্গত, দীর্ঘস্থায়ী ও সামগ্রিক শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যকর পথ হলো দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। এর আওতায় একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
ইসরাইল অবশ্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ইসরাইলি রাজনীতির ডানপন্থী অংশ পশ্চিম তীর ও অন্যান্য অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ আরো সম্প্রসারণের পে অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাজ্য-ইসরাইল সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন
ইসরাইলি বসতির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পদেেপর ফলে লন্ডন ও তেল আবিবের সম্পর্কেও নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের জবাবে ইসরাইল পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এর মধ্যে জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের সেবা প্রদানকারী ব্রিটিশ কনস্যুলেটের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং গাজাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয় রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপরে নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিণ দেয়ার ব্রিটিশ কার্যক্রম বন্ধের কথাও ইসরাইল জানিয়েছে।
ফলে ইসরাইলি বসতি ইস্যু এখন কেবল ফিলিস্তিন-ইসরাইল সঙ্ঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক এবং মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিক অবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীায় পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতও এবার বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার মতো পদপেকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে। এর অর্থ এই নয় যে আবুধাবি ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে যাচ্ছে; বরং এটি ইঙ্গিত করতে পারেÑ ইসরাইলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আইন ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পে চাপ সৃষ্টির একটি পৃথক কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করতে চাইছে আরব দেশগুলো।
এ অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে ঘোষণার বাইরে গিয়ে এসব দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা, বসতি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যক্তিগত জবাবদিহির েেত্র কতটা সমন্বিত পদপে নেয় তার ওপর।



