আলজাজিরা
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানের ওপর তাদের সমন্বিত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে, তখন পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো উল্লাস করেনি; বরং তারা এক চরম শঙ্কার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিল। দীর্ঘ বছর ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং তেহরানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার যে বিনিয়োগ রিয়াদ, দোহা বা মাস্কাট করেছিল, ইরানের সাম্প্র্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তা এখন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে এক ঐতিহাসিক কৌশলগত ভুল করেছে। গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবসহ জিসিসি দেশগুলো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি ছিল সে প্রচেষ্টারই ফসল। এমনকি বর্তমান সঙ্কট চলাকালেও সৌদি আরব স্পষ্ট করেছিল যে, তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ইরানকে আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতে দেয়া হবে না। গত ৫ মার্চ ইরান স্বয়ং সৌদি আরবের এ অবস্থানের প্রশংসা করেছিল। কিন্তু তার পরপরই প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তেহরানের এ বিধ্বংসী হামলা গভীর নৈতিক ও আইনি সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে ইরান ইসরাইলের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর দ্বিগুণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২০ গুণ বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজন নিহত ও ৭৮ জন আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং কাতারের রাস লাফান এলএনজি কেন্দ্রে আঘাত হানা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়া। বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এ পথ দিয়ে যায়। এ পথ বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সঙ্কটের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা ১৯৮০-র দশকের ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’-কেও হার মানাতে পারে।
জিসিসি দেশগুলো এ যুদ্ধে কোনো পক্ষ নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো নিরপেক্ষ দেশের বেসামরিক অবকাঠামো, বিমানবন্দর বা তেল শোধনাগারে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধের শামিল। তেহরান দাবি করছে যে, এসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি থাকায় তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু। তবে জিসিসির ১ মার্চের বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাদের মাটি থেকে কোনো হামলা চালানো হয়নি এবং তারা যুদ্ধের উসকানি এড়িয়ে চলেছে। কাতার এ হামলাকে ‘বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে।
কৌশলগত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
ইরানের এ কৌশলের একটি বড় ত্রুটি হলো, এটি পরোক্ষভাবে ইসরাইলি স্বার্থকেই রক্ষা করছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান যুদ্ধকে তার নিজের সীমান্ত থেকে সরিয়ে আরব প্রতিবেশীদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে আরব দেশগুলো নিরাপত্তার তাগিদে আরো বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পথকে প্রশস্ত করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি শর্তহীন যুদ্ধবিরতি জরুরি। কাতার এবং ওমান এখনো মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ছাড়া চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এশীয় শক্তিগুলোর (ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) উচিত দ্রুত হস্তক্ষেপ করা। কারণ এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অপূরণীয় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।


