নিজস্ব প্রতিবেদক
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চে শুনানি শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন।
এ মামলায় আদালতে আসামিপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, শিশির মনির ও রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা।
আইনজীবী শিশির মনির শুনানি শেষে বলেন, ‘এ মামলায় আসামিদের সাজা দেয়ার মতো কোনো এভিডেন্স নেই; বরং রাজনৈতিক স্বার্থে মূল আসামিদের বাদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য সাজা দেয়। এতে দেখা যায়, সরাসরি দেখছেন এ ধরনের কোনো সাক্ষী নেই, মৃত্যুকালীন জবানবন্দী যিনি দিয়েছেন তিনি বেঁচে আছেন, এতে তার জবানবন্দী গ্রহণযোগ্য নয়। হাইকোর্টের রায় বাতিল হয়ে আসামিরা খালাস পাবেন বলে মনে করি।’
মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও শ্রমিকনেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার গাজীপুর-২ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সমাবেশে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার রায় ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ঘোষণা করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে মামলার আসামি বিএনপির নেতা নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দু’জন মারা যান। ২০০৫ সালে নিম্ন আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টে যায়।
একই সাথে রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৫ জুন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। রায়ে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড ও দু’জনের যাবজ্জীবন বহাল রাখেন হাইকোর্ট। আর সাজা কমেছে সাতজনের। খালাস পেয়েছেন ১১ জন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ছয় আসামি হলেন- নুরুল ইসলাম সরকার, নুরুল ইসলাম দীপু, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, শহীদুল ইসলাম শিপু (৪ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে মারা যান), হাফিজ ওরফে কানা হাফিজ ও সোহাগ ওরফে সরু। যাবজ্জীবন বহাল রাখা হয় টিপু ও নুরুল আমিনের।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সাতজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তারা হলেন- মো: আলী, সৈয়দ আহমেদ হোসেন মজনু, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু, রতন মিয়া ওরফে বড় মিয়া রতন, জাহাঙ্গীর ওরফে ছোট জাহাঙ্গীর, আবু সালাম ওরফে সালাম ও মশিউর রহমান ওরফে মনু। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন আমির হোসেন, জাহাঙ্গীর ওরফে বড় জাহাঙ্গীর, ফয়সাল, রনি মিয়া ওরফে রনি ফকির, খোকন, লোকমান ও দুলাল মিয়া।
একই সাথে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন মনির, রকিব উদ্দিন সরকার ওরফে পাপ্পু, আইয়ুব আলী ও জাহাঙ্গীর। পরে দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন।
আ’লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ
এ দিকে আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়েছে। রিটে প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। রিটটি হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে গতকাল সোমবারের কার্যতালিকায় (কজলিস্টে) ছিল।
তবে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো শুনানি হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নুর মোহাম্মদ আজমী।
আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে গত বছরের ১২ মে ওই প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যেকোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।
ওই প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়ে মো: আল আমিন নামের এক ব্যক্তি রিটটি করেন। রিটে আবেদনকারীর ঠিকানায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উল্লেখ করা হয়েছে। তার পক্ষে রিটকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ ইউনুস।
রিটের আর্জিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১২ মের ওই প্রজ্ঞাপন জারি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়েছে। রুল হলে তা বিচারাধীন অবস্থায় ১২ মের প্রজ্ঞাপনটির কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া হয়েছে।



