- ১ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজপথে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা
- পুলিশ-আমলা-নির্বাচনী দোসরদের সক্রিয় করার অভিযোগ
- নেপথ্যে নিষিদ্ধ যুবলীগ-ছাত্রলীগ-শ্রমিক লীগের নেতারা
- ১০ হাজার কোটি টাকার ‘অপারেশন ফান্ড’ সংগ্রহের তথ্য
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে নির্বাচন বানচাল করতে পতিত আওয়ামী লীগ একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত ছক কষছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দু’টি- প্রথমত, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়, সে জন্য দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে নির্বাচনের মাধ্যমে নয়; বরং অন্য কোনো শক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ খুলে যায়।
এ লক্ষ্যে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী আমলাদের একটি অংশকে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ : তথ্যমতে, গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর অন্তত দুই শতাধিক কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে সাবেক আইজিপি শহিদুল ইসলাম, বেনজীর আহমেদ, সিটিসির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ ও সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের মতো কয়েকজনকে কোর নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
যদিও এদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছেন, অধিকাংশই বিদেশে অবস্থান করছেন। তবে তাদের সহযোগীরা বর্তমানে বিভাগীয় বদলি হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশে অবস্থানরত ওই কর্মকর্তাদের সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী আমলাদের সক্রিয় করার অভিযোগ : সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে প্রশাসনে প্রভাবশালী ছিলেন এমন একাধিক সাবেক সচিব ও শীর্ষ আমলা, যাদের কেউ বিদেশে, কেউ দেশে অবস্থান করছেন- নির্বাচন বানচালের ছকে জড়িত।
তাদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ, ড. আহমেদ কায়কাউস, ড. কামাল চৌধুরী, নজিবুর রহমান, কবির বিন আনোয়ারসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকের সহযোগী এখনো সচিবালয় ও গুরুত্বপূর্ণ দফতরে দায়িত্বে আছেন এবং নীরবে সমর্থন দিচ্ছেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা : ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ভূমিকা রাখা নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তাদের সহযোগী নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সাবেক সচিবরা বর্তমানে কারাগারে, তথাপি তাদের ঘনিষ্ঠরা নির্বাচনকালীন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন- এমন তথ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
পতিত দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা, যাদের একটি অংশ বর্তমানে ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছেন, কিভাবে এসব কর্মকর্তাকে নিষ্ক্রিয় রাখা যায়, সে বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
রাজপথে অস্থিরতার নেপথ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন : সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে আন্দোলনের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য করা হয়েছে- সরকারি ও বেসরকারি সেবা খাত; শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী; ছাত্র ও বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী- যাদের আন্দোলনে নামালে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
এই কর্মসূচির নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের ঢাকায় অবস্থানরত শীর্ষ নেতারা থাকবেন বলে অভিযোগ। ইতোমধ্যে তারা রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ছদ্মবেশে অবস্থান করছেন বলেও তথ্য মিলেছে।
১০ হাজার কোটি টাকার ‘ফান্ড’ সংগ্রহের অভিযোগ : সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো- নির্বাচন বানচালের জন্য মোট ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা।
সূত্র জানায়, পাঁচ হাজার কোটি টাকা পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের পেছনে আর পাঁচ হাজার কোটি টাকা মাঠপর্যায়ের আন্দোলন জোরদারে ব্যয় করার চিন্তা রয়েছে। এই অর্থের একটি বড় অংশ আসছে এমন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে, যারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের আগে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা সরিয়েছেন।
১৭ মাস পর ভারতে আ’লীগের প্রথম সংবাদ সম্মেলন : শেখ হাসিনার পতনের ১৭ মাস পর ভারতের মাটিতে প্রথমবার সংবাদ সম্মেলন করল আওয়ামী লীগ। শনিবার দিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী হাছান মাহমুদ-সহ হাসিনার দলের অন্য নেতারা। সেখানেই তারা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করেন। পাশাপাশি, দেশে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়েও তারা মুখ খুলেছেন।
এ দিন হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের দেশ। হাসিনা এবং আমরা অন্য যারা দেশের বাইরে আছি, তারা ফিরে আসতে চাই; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে আসন্ন নির্বাচন আইন মেনে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাতে হবে। বর্তমান সরকার প্রতিশোধপরায়ণ। তারা আমাদের সাথে কেবল শত্রুতাই চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। প্রত্যেকবারই আমরা জনগণের রায়ে ক্ষমতায় এসেছি। জনগণকে আমরা বিশ্বাস করি; কিন্তু ইউনূস সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ কখনোই ভালো কাজ করতে পারবে না।’
হাসিনার দলের দাবি, ইউনূস সরকার বাংলাদেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করাতে অক্ষম। তারা আওয়ামী লীগকে ভয় পাচ্ছে। তাই তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হচ্ছে না। প্রসঙ্গত, কলকাতার সংবাদ প্রতিদিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাকে ভয় পাচ্ছেন ইউনূস। তাই তার দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মন্তব্য : এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছে, তখন ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছেন- এমন তথ্য উদ্বেগজনক। ড. ইউনূস সফল হলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের সুযোগ থাকবে না- এটা দলটি ভালোভাবেই জানে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ কারণে নির্বাচন বানচালই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।’ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এই সময়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সতর্কতাই নির্ধারণ করবে- বাংলাদেশ একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে পারবে কি না।



