বাংলাদেশে বিদ্যুতের সঙ্কট আছে- এমন ধারণা এখন আর বাস্তবতার সাথে মেলে না। বরং বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সঙ্কট মূলত কাঠামোগত, আর্থিক ও নীতিগত। উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও বিপুল অঙ্কের অর্থ গুনতে হচ্ছে অব্যবহৃত কেন্দ্রগুলোর জন্য। এর ফলে চাপ বাড়ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক সক্ষমতার ওপর, জাতীয় বাজেটে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলেও।
বিপিডিবির নিজস্ব প্রতিস্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিবরণী অনুযায়ী, আমদানি বাদ দিয়ে দেশের ডিরেটেড বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অথচ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল মাত্র সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই দিন প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা প্রয়োজনই হয়নি। গড় দৈনিক চাহিদা সাধারণত ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকে এবং সর্বোচ্চ চাহিদাও খুব কম ক্ষেত্রেই ১৮ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করে। জাতীয়ভাবে ২৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকা অবস্থায় এই বিপুল অব্যবহৃত সক্ষমতার জন্য অর্থ প্রদান অর্থনীতির জন্য এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে। ২৬ ফেব্রুয়ারির উৎপাদন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সন্ধ্যার পিক আওয়ারেও শূন্য মেগাওয়াট উৎপাদন করেছে। গগনগর ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, আনোয়ারা ৩০০ মেগাওয়াট, জুলদা ১০০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রাম ১০৮ মেগাওয়াট ও ফেনী ১১৪ মেগাওয়াট কেন্দ্র সব ক’টিই সচল অবস্থায় থেকেও উৎপাদনের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু উৎপাদন না করলেও এসব কেন্দ্র নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পাচ্ছে।
বাংলাদেশে একটি ১০০ মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ ডলার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পায়, বছরে যা দাঁড়ায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা থেকে ২২১ কোটি টাকা। এই অর্থ দেয়া হচ্ছে শুধুমাত্র কেন্দ্রটি প্রস্তুত আছে এই যুক্তিতে। এমন কেন্দ্রের সংখ্যা কয়েক ডজন হওয়ায় সামগ্রিকভাবে এটি হয়ে উঠেছে এক বিশাল আর্থিক রক্তক্ষরণ।
এই অবস্থার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১০ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন (যাকে দায়মুক্তি বা কালো আইন বলা হয়)। বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় জরুরি পরিস্থিতিতে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। তখন দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু সেই জরুরি আইনই পরে একটি সমান্তরাল ক্রয়ব্যবস্থার জন্ম দেয়, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, মূল্য নির্ধারিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যাপাসিটি চার্জ নিশ্চিত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৬৫টি প্রকল্প এই আইনের আওতায় অনুমোদন পেয়েছে। সঙ্কট কেটে যাওয়ার বহু বছর পরও এসব চুক্তি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে এখন সংস্কারের প্রথম শর্ত হচ্ছে প্রকল্পগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা; প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে পাওয়া প্রকল্প এবং বিশেষ আইনের আওতায় পাওয়া প্রকল্প। এই দুই ধরনের প্রকল্পকে এক কাতারে বিবেচনা করা অর্থনৈতিক ও নীতিগতভাবে ভুল হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় দুর্বলতা জ্বালানি আমদানি কাঠামো। অধিকাংশ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সরাসরি জ্বালানি আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর ফলে বহু পৃথক আন্তর্জাতিক চুক্তি হচ্ছে, বড় পরিসরে জ্বালানি কেনার সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে বেরিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি চলমান ডলার সঙ্কটের মধ্যে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানির ব্যয় কেন্দ্রের ঘোষিত দক্ষতা ও হিট রেটের সাথে যুক্ত। যদি এগুলো স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত না হয়, তা হলে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার সরাসরি ডলার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এটি শুধু বিদ্যুৎ খাতের বিষয় নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি। এই প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে তরল জ্বালানি আমদানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসির) মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা। কেন্দ্রীয়ভাবে বড় পরিসরে জ্বালানি কেনা গেলে ইউনিটপ্রতি দাম কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় স্বচ্ছ হবে এবং প্রকৃত উৎপাদনের সাথে জ্বালানি ব্যবহারের মিল নিরীক্ষা করা সহজ হবে।
অপর দিকে, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তবতা দেখলেই বোঝা যায়, বিকেন্দ্রীভূত আমদানিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের বাণিজ্য ও পুনর্বণ্টনের ঝুঁকি থাকে। বৈদেশিক মুদ্রা সুরক্ষা ও জ্বালানি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হলে এই খাতকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। তাদের মতে, সংস্কারের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। প্রথমত, ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদিত সব প্রকল্পের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এতে জনগণ জানতে পারবে কোনো কেন্দ্র উৎপাদন না করেও অর্থ পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে নির্ধারিত ট্যারিফকে মানদণ্ড ধরে অপ্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পগুলোর ট্যারিফ সমন্বয় করতে হবে। প্রতিযোগিতা এড়িয়ে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। তৃতীয়ত, সব তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য বিপিসির মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং দক্ষতা নিরীক্ষা চালু করতে হবে।
জ্বালানি খাতের সাথে জড়িত বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এক সময় বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলায় নেয়া দ্রুত সিদ্ধান্তগুলো আজ উল্টো আর্থিক দায়ে পরিণত হয়েছে। লোডশেডিং কমেছে, উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু তার বিনিময়ে তৈরি হয়েছে এমন একটি কাঠামো, যেখানে অতিরিক্ত সক্ষমতা, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ খাতটিকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ এখন অন্ধকারে নয়, বরং এক ভিন্ন ধরনের সঙ্কটে, যেখানে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক কাঠামো অতিরিক্ত ব্যয়কে পুরস্কৃত করছে, প্রতিযোগিতাহীন চুক্তিকে রক্ষা করছে এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বের করে দিচ্ছে। সঙ্কট এখন উৎপাদনের নয়, কাঠামোর। আর এই কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে সবচেয়ে কঠিন জায়গা থেকেই শুরু করতে হবে; চুক্তিগুলো আলাদা করা, ট্যারিফ মানসম্মত করা, জ্বালানি আমদানি কেন্দ্রীয় করা এবং তথ্য উন্মুক্ত করা। তবেই বিদ্যুৎ খাত সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থে কাজ করছে এ দাবি করা সম্ভব হবে।



