দেশের বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান বিপুল পরিমাণ লোকসান জাতীয় বাজেটে অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। কয়েক বছর ধরে এই খাতের জন্য সরকারকে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করতে হচ্ছে, যা আদায় করা হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে কর হিসাবে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি চলতি এবং আগামী অর্থবছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে, যা সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলাকে আরো নাজুক করে ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ দিকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনুমোদন দেয়া, বিদ্যুৎ কেনায় দুর্নীতির কারণে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান বেড়েই চলেছে। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় বিদ্যুৎখাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ দেনা রেখে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখার জন্য এই দেনা পরিশোধ করে দেয়। দেনা পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই দেনার টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে এককালীন নেয়া হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত (গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত) এই খাতে ভর্তুকির অর্থ ছাড় করা হয়েছে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর আগের বছরও ভর্তুকি বাবদ ছাড় করা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বকেয়া অর্থ চাওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই অর্থের বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি বলে জানা গেছে।
অর্থ বিভাগ মনে করছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর যে নতুন সরকার আসবে তারা যদি বিদ্যুতের দাম না সমন্বয় করে তবে এখানে লোকসান ও ভর্তুকির পরিমাণ আরো বাড়বে। কারণ নতুন সরকার চাইবে না দায়িত্ব নেয়ার পরই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির। অন্তত এক বছরের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে না বলে আমরা মনে করছি।
লোকসানের তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি : বিদ্যুৎ খাতের লোকসানের তথ্য নিয়ে নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এক অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এক বছরে লোকসান বেড়েছে ৮ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
অন্য দিকে অর্থ বিভাগের গত ডিসেম্বরের প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫-এ বিপিডিবির লোকসান অনেক কম দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে আট হাজার ৮০৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর আগের বছর (২০২৩-২৪) সাময়িক হিসেবে লোকসান ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৮৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার নয়া দিগন্তকে জানান, অর্থনৈতিক সমীক্ষায় যে তথ্য বা পরিসংখ্যানগুলো দেয়া থাকে তা মূলত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর ও প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। তারা যেসব তথ্য আমাদের কাছে পাঠায় সেগুলোই সমীক্ষায় দেয়া হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে তথ্যে যাচাই-বাছাইর কোনো সুযোগ নেই। তবে সংশোধনী থাকলে তা পরের অর্থবছরে দেয়া হয়।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ভর করে উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণের বেশি বাড়ানোর পর লোকসান দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পিডিবির লোকসান এক হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। গত ১৭ বছর ধরে পিডিবি টানা লোকসানের মধ্যেই আছে বলে জানা গেছে।
দেউলিয়ার পথে বিপিডিবি!
এ দিকে আওয়ামী লীগের সময় বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে যাতে কেউ কথা না বলতে পারে তার জন্য একটি ‘বিশেষ আইন’ করা হয়। ‘বিশেষ বিধান’ আইনের আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো দেশের স্বার্থে নয়, বরং ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেয়ার জন্য করা হয়েছিল। এর ফলে বিপিডিবি এখন দেউলিয়ার পথে এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৫ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।
কমিটির তাদের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০১৫ সালে পিডিবি’র লোকসান ছিল যেখানে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা দশগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হয় ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, কিন্তু তারা বিক্রি করছে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, পিডিবিকে কেবল টিকিয়ে রাখতেই বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিশেষ আইনের আড়ালে হওয়া চুক্তিগুলোর কারণে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৮০ শতাংশ, তেলে ৫০ শতাংশ এবং গ্যাসে ৪৫ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে বিশেষ বিধান আইনের আড়ালে ক্রয় ও চুক্তি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে রাষ্ট্র দখলের রূপ নেয়। যেখানে লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ ও চুক্তি সীমিত সংখ্যক স্বার্থান্বেষীর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। তিনি বলেন, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সার্বভৌম গ্যারান্টি ও আন্তর্জাতিক সালিসি সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। দেশের বাইরে বিদ্যুৎকেন্দ্র (আদানি) অথচ ঝুঁকির দায় বাংলাদেশের। গ্যাস শেষের পথে তারপরও সামিট গ্রুপকে একই জায়গায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেয়া হয়েছে।
কেবল ‘বিশেষ বিধান’ আইন বাতিল করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করে জাতীয় কমিটি। ওই আইনের আওতায় সম্পাদিত আদানি চুক্তি বাতিল, অন্যান্য চুক্তি পর্যালোচনা করা, সব চুক্তি না হলেও যেসব চুক্তির মাধ্যমে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেগুলোও আবার পর্যালোচনা চালানোর পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এখনই কঠোর সংস্কার না করলে এই সঙ্কট স্থায়ী হবে এবং ভর্তুকির পাহাড়সম বোঝা সাধারণ মানুষের ওপরই চেপে বসবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। এটি জ¦ালানি উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম কী বাড়ছে?
নির্বাচনের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঘাটতি কমাতে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষে বক্তব্য দেন উপসচিব মোহাম্মদ সোলায়মান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বরাদ্দ চাইতে হলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেন ভিক্ষা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের পরপরই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসিতে আসতে হবে বলে জানান তিনি।
তবে পাইকারি পর্যায়ে নাকি গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি বিদ্যুৎ বিভাগের এই কর্মকর্তা। আর এই দাম বাড়ানো হলে কয়েক বছর ধরে চলে আসা মূল্যস্ফীতি আবারো দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করবে। গত এক বছরে যা অনেক কষ্ট করে আটের ঘরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে করে জনগণের নাভিশ^াস দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।



