ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সারা দেশ। নির্বাচনী প্রচারণাকালে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। নির্বাচনী ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিতে নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন বিভিন্ন প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা। এরই মধ্যে একটি দল ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে এমপিওভুক্ত মাদরাসাশিক্ষকদের নির্বাচনী দায়িত্বে (প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার) না রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলটির পাশাপাশি এ কাজে রিটার্নিং অফিসার (ডিসি) এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের (ইউএনও) ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন দলটির সমর্থিত সুবিধাভোগী সাবেক ও বর্তমান আমলারা। কর্মকর্তাদের নির্দেশে আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে অতি উৎসাহী হয়ে রিটার্নিং অফিসাররা (ডিসি) এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের ওপর (ইউএনও) চাপ দেয়া হচ্ছে। গতকাল দেশের কয়েকটি জেলার মাঠ প্রশাসনে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষকদের নিয়ে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তার প্যানেল প্রস্তুত সংক্রান্ত চিঠিতে ডিসি-ইউএনওদের বলা হয়, সরকারি/সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত উচ্চবিদ্যালয়/মাধ্যমিক বিদ্যালয়/ সমমানের মাদরাসার প্রধান শিক্ষক/সহকারী প্রধান শিক্ষক, ক্ষেত্র বিশেষে সিনিয়র শিক্ষক প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি/সরকারি অনুদান প্রাপ্ত উচ্চবিদ্যালয়/মাধ্যমিক বিদ্যালয়/সমমানের মাদরাসার প্রধান শিক্ষক/সহকারী প্রধান শিক্ষক/সিনিয়র শিক্ষক/শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করবেন।
পোলিং অফিসার সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি/সরকারি অনুদান প্রাপ্ত উচ্চবিদ্যালয়/মাধ্যমিক বিদ্যালয়/সমমানের মাদরাসার শিক্ষক/কর্মচারী পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ঢাকা বিভাগের একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজ/মাদরাসা সবই এক বিষয়। যদি রেশিও হিসাব করে স্কুল/কলেজ থেকে ৫০% আসে, তবে বাকি ৫০% তো মাদরাসা থেকেই আসা উচিত। এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজ সবাই নিরপেক্ষ আর এমপিওভুক্ত মাদরাসা সবাই জামায়াতপন্থী এরকম তো বিষয় না। সুনির্দিষ্ট এক/দুইজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, সবাইকে তো গণহারে ক্যাটেগোরাইজ করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, মাদরাসা শিক্ষকদের বাদ দিতে একজন সাবেক আমলা আমার অফিসে এসে চাপ দিচ্ছেন। তার কথা মতো কাজ না করায় বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন সিনিয়র অফিসার দিয়েও চাপ প্রয়োগ করছেন। সুবিধা করতে না পেরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রেখেছেন।
দেশের পূর্বাঞ্চলের একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসার জানান, একজন সিনিয়র অফিসার মাদরাসা শিক্ষকদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা না করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু বেআইনি এই চাপে পাত্তা না দিলে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে যান। জেলা প্রশাসক অতি উৎসাহী হয়ে আমাদের মাদরাসা শিক্ষকদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা না রাখতে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।
একইভাবে দেশের বেশকিছু জেলায় রিটার্নিং অফিসাররা সহকারী প্রিজাইডিং, পোলিং অফিসার নির্বাচনী দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষকদের বাদ দিতে বলছে। কারণ হলো বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের অভিযোগ- তারা প্রায় সবাই নাকি জামায়াতঘেঁষা। এজন্য এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজের শিক্ষকরা প্রায়োরিটি পাবে। মাদরাসা টোটালি বাদ যাবে। এর আগে তারা একইভাবে ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কিছু ইসলামী শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব প্রদানের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল।
গত ২৬ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের প্যানেল পর্যালোচনা এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক থাকলে তাদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রার্থীদের করণীয় বিধি অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসার/সহকারী রিটার্নিং অফিসার প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের একটি খসড়া প্যানেল তৈরি করবেন এবং সেই প্যানেল প্রকাশ করবেন। বিএনপির প্রার্থী এবং প্রার্থীর এজেন্টকে অবশ্যই এইসব নির্বাচনী অফিসারদের তালিকা দেখে খুঁজে বের করতে হবে যে, সেখানে জামায়াত-এনসিপি জোট বা ফ্যাসিবাদের সমর্থক অথবা ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত কোনো সংস্থার কোনো ব্যক্তিকে নির্বাচনী দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কিনা। এরকম কাউকে শনাক্ত করতে পারলে সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন আপত্তি জানাতে হবে এবং তাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার জন্য রিটার্নিং অফিসার/সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে লিখিতভাবে অনুরোধ জানাতে হবে এবং তার কপি কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে পাঠাতে হবে। এ ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার/সহযোগী রিটার্নিং অফিসারের মতামত কিংবা সিদ্ধান্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে গেলে তা তৎক্ষণাৎ পরিচালনা কমিটি, ২০২৬’ কে অবহিত করতে হবে।
প্লাস্টিকের দাঁড়িপাল্লা ঝুলানোতে আপত্তি : প্রতীকের বিষয়ে বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট কিছু বলা না থাকলেও অনেক জেলায় রিটার্নিং অফিসাররা একটি রাজনৈতিক দলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িপাল্লাকে টার্গেট করে প্লাস্টিকের প্রতীক ঝুলানো যাবে না মর্মে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন।
বিধিমালায় বলা আছে, অপচনশীল দ্রব্য দিয়ে প্রচারপত্র, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন, ব্যানার করা যাবে না। কিন্তু প্রতীকের বিষয়ে কিছু বলা নেই। প্রতীকের ক্ষেত্রে শুধু জীবন্ত প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না আর তিন মিটার সাইজ পর্যন্ত ঝুলানো যাবে এমন বলা আছে।
ইসির নিয়মানুযায়ী, যে বিষয়ে বিধিমালায় স্পষ্ট করে বলা নেই এমন কোনো বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলে সেটা নির্বাচন কমিশনের সভায় উপস্থাপিত হবে, সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। বিধিমালায় স্পষ্ট বলা নেই এমন বিষয়ে রিটার্নিং অফিসাররা এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার রাখেন না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



