আলি জামশেদ বাজিতপুর-নিকলী (কিশোরগঞ্জ) থেকে
হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বারখ্যাত কিশোরগঞ্জের নিকলী ও বাজিতপুরসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে আসন্ন ঈদুল আজহা ঘিরে মাদককারবার ও চুরির উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে খামারি ও কৃষকদের গোয়াল থেকে কোরবানির পশু চুরির ঘটনায় স্থানীয় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও অস্বস্তি বিরাজ করছে। তবে প্রশাসন বলছে, অপরাধ বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নজরদারি ও কঠোর অভিযান চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের মতে, বর্ষা মৌসুমে নৌপথ ব্যবহার করে হাওরাঞ্চলে মাদকের বড় বড় চালান আসছে। আর এই মাদকের টাকার জোগান দিতেই এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালও ইতঃপূর্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও একাধিক গণমাধ্যমে হাওরাঞ্চলে মাদকের কুপ্রভাব এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন।
গোয়াল খালি করে নিয়ে যাচ্ছে কোরবানির পশু
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০ মে (বুধবার) নিকলী উপজেলার সাজনপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষক হামিদ মিয়া গুপিরায় বাজারের হাটে এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় আ: সালামের কাছে একটি ষাঁড় বিক্রি করেন। চোরের ভয়ে ক্রেতা সালাম মিয়া ষাঁড়টি বিক্রেতা হামিদের গোয়ালেই রেখে যান, শর্ত ছিল ঈদের দিন নিয়ে যাবেন। কিন্তু পরদিন ২১ মে দিবাগত রাতে চোরচক্র ওই ষাঁড়সহ হামিদের গোয়ালে থাকা ৯০ হাজার টাকা মূল্যের আরেকটি ষাঁড় চুরি করে নিয়ে যায়। বর্তমানে গরু দু’টি ফেরত পেতে চোর সিন্ডিকেটের সাথে একপ্রকার দফারফা ও দরকষাকষি চলছে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ১৫ মে রসুলপুর উত্তরপাড়ার সাইদুর মিয়ার চার লক্ষাধিক টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় ও দু’টি গাভী গোয়াল কেটে নিয়ে যায় চোরেরা। সাজনপুরের গরু ব্যবসায়ী দীন ইসলাম জানান, কুর্শা এলাকা থেকে তার আত্মীয়ের এক লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় চুরি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই এমন চুরির খবর পাওয়ায় খামারিদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
দুর্গম নৌপথ : মাদকপাচারের নিরাপদ রুট
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক মাদককারবারি জানান, সবচেয়ে বেশি ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল আসে হাওরাঞ্চলের নৌপথে। ভারতের সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জ অঞ্চল থেকে পাথর, বালু ও কয়লার চালানের আড়ালে কোটি কোটি টাকার মাদকের চালান ঢুকছে। এসব মাদক অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, নিকলী-বাজিতপুর, কুলিয়ারচর ও ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ভৈরবের কালিকা প্রসাদ এলাকায় ফেনসিডিলের বড় আখড়া রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, এক মাসের ব্যবধানে সাজনপুর-আঠারবাড়ীয়া এলাকা থেকে চিহ্নিত চোর ও মাদককারবারি মাহবুব, কাউছার ও শাহীদসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হলেও চোরের উপদ্রব কমেনি। এই সিন্ডিকেটের পেছনে বাদশা ডাকাত, কাইয়ুম এবং মাদকসম্রাট বছিরসহ বেশ কয়েকজন কুখ্যাত অপরাধী জড়িত। এসব অপরাধী প্রায়ই ধরা পড়ে হাজতে যায়, আবার জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে লিপ্ত হয়।
নিকলী উপজেলাধীন ছাতিরচর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদ হাসান জাকির বলেন, ‘বর্ষা এলেই দ্বীপসদৃশ এই এলাকাগুলোতে নৌপথে মাদকের উপদ্রব বহুগুণ বেড়ে যায়। আর মাদকের কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। গত ২৪ মে মিনহাজ নামের এক গরুচোরকে হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী।’
ছাতিরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান চৌধুরী ওরফে ইয়ার খান বলেন, ‘মাদকের সাথে জড়িতরাই মূলত চুরি-ছিনতাই করছে। বর্ষায় নৌপথে মাদকের তৎপরতা বাড়ে। গতকালও এক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
বাজিতপুর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাওরের প্রবেশদ্বার বাজিতপুরে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের মাত্রা কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। তবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও তা দমনে একের পর এক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।’
যা বলছে পুলিশ প্রশাসন
নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুবুর আলম জানান, মে মাসে এ পর্যন্ত মাদক, জুয়া ও চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগে মোট ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছাতিরচর ইউনিয়ন থেকে এক গরুচোরকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাজিতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম শহিদুল্লাহ জানান, ১ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত মাদক, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় ৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন ডাকাতও রয়েছে। কোরবানির ঈদ ঘিরে পশুর হাট ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের এই সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ২৫ মে দুপুরে ও বিকেলে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
একইভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।



