রাজধানীর পশ্চিমে পিচ্চি হেলালের সেকেন্ড ইন কমান্ড জাহিদ মোড়ল আতঙ্ক

Printed Edition
রাজধানীর পশ্চিমে পিচ্চি হেলালের সেকেন্ড ইন কমান্ড জাহিদ মোড়ল আতঙ্ক
রাজধানীর পশ্চিমে পিচ্চি হেলালের সেকেন্ড ইন কমান্ড জাহিদ মোড়ল আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সহযোগী জাহিদ মোড়ল এখন মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকার আতঙ্ক হয়ে উঠছে। কথায় কথায় সে নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে ওই এলাকার ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের ওপর। তার কথার কোনো ব্যত্যয় ঘটলেই নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। এক সময় পিচ্চি হেলাল যেরূপ আতঙ্কের নাম ছিল, এখন তারই শিষ্য জাহিদ মোড়ল ওই এলাকার মানুষের কাছে ভয়ানক আতঙ্কের নাম। তবে এরসবই পিচ্চি হেলালের নির্দেশেই জাহিদ মোড়ল করে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

গত ২৪ মার্চ ও ২৮ এপ্রিলসহ কয়েক দফায় মোহাম্মদপুর টাউন হলের মনির নামের এক ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি চালায় এই জাহিদ মোড়ল ও তার সহযোগীরা। চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ওই ব্যবসায়ীকে কয়েক দফায় হুমকি দেয় জাহিদ। এর পরও চাঁদা না দেয়ায় তার বাসা ও অফিসে কয়েক দফায় গুলি চালানো হয়। এই ঘটনায় জাভেদ ও মোহাম্মদ হাসান মাহমুদ নামের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকেই জানা যায়, এই ঘটনার নেপথ্য নায়ক জাহিদ মোড়ল পিচ্চি হেলালের সেকেন্ড ইন কমান্ডের কথা।

১৬ মার্চ লালমাটিয়ার জাকির হোসেন রোডের মাঠের পাশে একটি ইন্টারনেট অফিস দখলে নিতে গুলি চালায় এরা। চাঁদা না দেয়ায় স্থানীয় ময়লা পরিষ্কারের কাজটিও তারা দখলে নেয়।

ধানমন্ডি এবং নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরাও অতিষ্ঠ এই জাহিদ মোড়লের অত্যাচারে। বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে সে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী বলেছেন, জাহিদ মোড়ল প্রায়ই লোক পাঠিয়ে চাঁদার টাকা নিয়ে যায়। দিতে না চাইলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ধানমন্ডি ১৫ নম্বর এলাকার এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, গোটা এলাকা অতিষ্ঠ করে তুলেছে এই জাহিদ মোড়ল।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় পিচ্চি হেলালের কয়েকশ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রয়েছে। এরমধ্যে সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পালন করছে এই জাহিদ মোড়ল। আরো রয়েছে, লিটন মাহমুদ বাবু ওরফে তেরেনাম বাবু, মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান, ওয়াহিদুল হাসান দিপু, মফিজ উদ্দিন মফি, মজিদ ওরফে ভাঙ্গাড়ি মজিদ, দোলন, রিয়াজ, সালাউদ্দিন, ভাগনে শুভ, গিট্টু রানা, সাব্বির, চিকু শাকিল, দিপু, হাসান, জুয়েল, রাসেল, ইউসুফ, পেটকা তুহিন, ফালান, দিদার, মো: জুয়েল ও রফিক।

বিভিন্ন এলাকার ডিস ব্যবসা, নেট ব্যবসা এদেরই নিয়ন্ত্রণে। এদের মদদে ওইসব এলাকায় প্রকাশ্যে এখন মাদক ব্যবসা চলছে।

ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। দীর্ঘ ২৪ বছর পর গত ১৫ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সে। মুক্তির পরই রাজধানীর নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর-আদাবর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগের একক নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয় এই হেলাল। আধিপত্য বিস্তারের জন্য অন্য গ্রুপগুলোর সাথে একের পর এক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে। সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনায় পৃথক দু’টি মামলায় পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ আটটি মামলার বিচার চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারের সাদেক খান আড়তের সামনে নির্মাণশ্রমিক নাসিরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই সুমন বিশ্বাস বাদি হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নাসিরের পরিচিত শাওনের মোটরসাইকেলে বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়ে যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় নাসিরের ওপর। তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নাসিরকে গুরুতর আহত করে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে নাসিরের স্বজনরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রাতেই মৃত্যু ঘটে নাসিরের। এই হত্যা মামলায় ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্ছি হেলাল, রাহুল, শাহরুখ, রয়েল, পারভেজ, ইমন ওরফে এলেক্স ইমনসহ মোহাম্মদপুরের আরো অজ্ঞাত ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। একইভাবে হত্যা করা হয়েছে মুন্নাকে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছর ওই এলাকায় চাঁদাবাজি করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা। সক্রিয় ছিল যোশেফ-হারিছ বাহিনী, অনু, রাজিব, সলু, সাদেক খানের বাহিনী। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন ওই এলাকার মানুষ। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যায় তারা। ১৫ আগস্ট কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন পিচ্চি হেলাল। জামিন পেয়েই ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, লালমাটিয়া এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেন পিচ্চি হেলাল।

পিচ্চি হেলালের নেতৃত্বে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুরের বাসস্ট্যান্ড, মার্কেট, ফুটপাথ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদবাজি শুরু হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, জেলে বসেই মোহাম্মাদপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো পিচ্চি হেলালের নামে। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতা, জনপ্রতিনিধিরাও চাঁদার ভাগ দিতেন পিচ্চি হেলালকে। ৫ আগস্টের পর জেল থেকে বের হয়ে সে তার নতুন বাহিনী গড়ে তোলে। যেখানে জাহিদ মোড়ল সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পালন করছে। পরপর বেশ কয়েকটি খুনসহ অগণিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পিচ্চি হেলালের নাম উঠে এলে আত্মগোপনে চলে যায় হেলাল। কিন্তু তার বাহিনী ঠিকই সক্রিয় আন্ডারওয়ার্ল্ডে।