বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বহুল আলোচিত ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি (পিপিএ) নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে শুরু থেকেই ‘অসম’, ‘অস্বচ্ছ’ ও ‘অতিরিক্ত ব্যয়বহুল’ বলে সমালোচনা করে আসছিলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির চাপ, ডলার-সঙ্কট এবং উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ আমদানির আর্থিক বোঝা সামনে আসায় বিষয়টি আবারো আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এ নিয়ে গতকাল বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রেজাউল করিম ও পর্যালোচনা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের সময়ে করে যাওয়া বিভিন্ন চুক্তিতে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না সেটি খুঁজে বের করতে একটি কমিটি গঠন করে রিপোর্ট রেখে গেছে। আমরা সেই রিপোর্ট পর্যালোচনা করছি।
জাতীয় কমিটি আদানির সাথে চুক্তি বাতিলের সুপারিশ করে গেছে সেই বিষয়ে ভাবছেন কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছু মেনে নেব না। আমরা কমিটির রিপোর্টগুলো এখন পর্যালোচনা করে দেখছি। পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কী করা হবে।
একই বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আমরা দেশের স্বার্থ সবার আগে বিবেচনা করব। বিভিন্ন বিষয় এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
আদানির চুক্তির বিষয়ে পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বৈঠক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘আমি হ্যাপি, আশা করছি আমাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে’।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদানির সাথে অসম চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে এক দিকে যেমন রাষ্ট্রীয় আর্থিক দায় কমানোর চেষ্টা চলছে, অন্য দিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে।
চুক্তির পটভূমি
২০১৭ সালে ভারতের শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের সাথে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই হয়। চুক্তির আওতায় ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলা হয়।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করে আদানি পাওয়ার এবং সেখান থেকে সরাসরি ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আনা হচ্ছে। চুক্তির বেশির ভাগ শর্তই গোপন রাখা হয়েছিল। চুক্তি সইয়ের সময় সরকার এটিকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখালেও শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে- এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি। ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ, যেমন বিদ্যুৎ না নিয়েই বছরে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। কয়লার মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন, চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কেন ‘অসম’ বলা হচ্ছে
চুক্তিটি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া বিশেষ আইনের আওতায় করা হয়েছিল, যা এখন প্রশ্নের মুখে। পিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চুক্তির অনেক শর্তই তখন প্রকাশ করা হয়নি। এখন পূর্ণাঙ্গ হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুতের প্রকৃত দাম শুরুতে যা বলা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি।’ সরকারি নথি ও পিডিবি সূত্রে পাওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আদানি বিদ্যুতের ইউনিট-প্রতি খরচ (পরিবর্তনশীলসহ) : ১১-১৪ টাকা পর্যন্ত উঠেছে, যেখানে দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্য আট থেকে ৯ টাকা। আর গ্যাসভিত্তিক পুরনো কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে তিন থেকে পাঁচ টাকায়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তির বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের জন্য আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ। বিদ্যুৎ নেয়া হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে কম চাহিদার সময়ও বিপুল অর্থ দিতে হচ্ছে পিডিবিকে।
দ্বিতীয়ত, কয়লার মূল্য নির্ধারণ। চুক্তিতে কয়লার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি ধরে হিসাব করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বিদ্যুতের ইউনিট-প্রতি মূল্য বেড়ে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত ডলারে পরিশোধের চাপ। পুরো বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রায়। ডলার সঙ্কটের সময়ে এটি বড় চাপ তৈরি করছে।
চতুর্থ, ‘টেক অর পে’ ধারা। নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ না নিলেও মূল্য দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতার বাস্তবতায় আরো বোঝা বাড়িয়েছে।
আর্থিক প্রভাব
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। গ্যাস সঙ্কট, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং ডলার সঙ্কটের কারণে অনেক কেন্দ্র বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এর মধ্যেই উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির বড় অংশ যাচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জে। ডলার সঙ্কটে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে চাপ বাড়ছে পাশাপাশি খুচরাপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক দায় পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে আদানি চুক্তিকে অন্যতম বড় দায় হিসেবে দেখছে।



