সালেহ আব্দুর রাজ্জাক
ফাহিম খুবই ভদ্র, শান্ত ও কোমল একটি ছেলে। বড্ড উদার মনের এক কিশোর। নিজের সব কিছু বিলাতেই সুখ পায়। ঠিক আকাশ যেমন তার সব কিছু পৃথিবীর জন্য উজাড় করে দিতে ভালোবাসে। ফাহিম ও তার মা ‘রাহেলা বানুর’ ছোট্ট সংসার। গাজীপুরের ছোট একটি বস্তিতে থাকেন তারা। ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরেই ওদের বসবাস। ঘরের সামনে দিয়ে তিরতির করে বয়ে গেছে একটি সরু গলি; যার শেষ মাথায় ফাহিমের স্কুল। এ বছর ক্লাস ফোরে পড়ছে ফাহিম। খুবই মেধাবী ছাত্র সে। প্লে থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসেই ‘এক নম্বর’ হয়েছে। এ জন্য মা রাহেলা ও স্কুলের শিক্ষকদের নয়নের মনি ফাহিম। পড়ালেখার পাশাপাশি অনেক মহৎ গুণাবলি আছে ফাহিমের। শিখেছে অনেক কিছুই- ‘মানুষকে যেমন ভালোবাসতে হয়, ঠিক তেমনি ভালোবাসতে বাসতে হয় প্রাণীকুলকেও। অসুস্থ লোকের সেবা করা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের উপকার বৈ অপকার না করা’ এরকম অনেক ভালো কথা ও কাজের ফিরিস্তি দিয়ে ওর শিশুমনটা ভরে উঠেছে। এসব কিছু শিখেছে ওর ‘মা’ রাহেলার কাছ থেকে। আম্মুই ওর প্রথম শিক্ষিকা। হাতে ধরে ধরে তিনি এসব কিছু শিখিয়েছেন। ফাহিমেরও বড্ড ভালো লাগে তার মাকে। তার কথা মতোই সে চলে। কেননা, তিনি ওর কোনো ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখেন না। সব আবদার-চাওয়া পূরণে সর্বদা চেষ্টা করেন মা রাহেলা বানু। যেন ফাহিম ওর বাবার অভাব বুঝতে না পারে। গত বছর ওর বাবার ‘রফিক’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হন। সেই থেকে রাহেলা বানু গার্মেন্টসে ছোটখাটো একটি চাকরি করছেন, যা বেতন পান তা দিয়ে সংসারের খরচ আর ফাহিমের স্কুল-ফি মেটাতেই হিমশিম খান। তবুও নিজে শত কষ্টে থাকলেও সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি যথেষ্ট খেয়াল রাখেন। এই তো কদিন আগেও যখন ফাহিম এসে কান্না জুড়ে দিল- আম্মু! আমার সব বন্ধুদের সাইকেল আছে, ওরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়, আমিই শুধু হেঁটে স্কুলে যাই। তাই আমার সাইকেল লাগবে, এখনি লাগবে। সাইকেল কিনে দাও নয়তো স্কুলে যাবো না, ভাতও খাবো না। পড়লাম বসে। ফাহিম স্কুলে যায় না, বাইরেও বের হয় না। সারাদিন ঘরে বসে থাকে, ভাতও খায় না ঠিকমতো। তাই রাহেলা বানু নিজের হাত খরচের টাকাসহ ধারদেনা করে একখানা লাল টুকটুকে সাইকেল কিনে আনেন ফাহিমের জন্য। সাইকেলটি পেয়ে খুশিতে ফাহিম সাইকেলের মতোই লাল টুকটুকে হয়ে যায়। সাইকেলটি ওর খুব পছন্দ হয়েছে, একেবারে মনের মতো। যেমনটি ও মনে মনে চেয়েছিল। সাইকেলটি একবার ডান দিক থেকে দেখে, আরেকবার বাম দিক থেকে। ছুঁয়ে দেখে। মিটিমিটি হাসে। ফাহিম ওর স্কুলের বন্ধুদেরকে দেখায়, জিজ্ঞেস করে। কেমন দেখতে ওর সাইকেল খানা? পাড়ার ছেলেদেরকেও জিজ্ঞেস করতে ভুলেনি! শুধু কি তাই! ওদের বাগানের আম-লিচু গাছ এবং ওর ছোট্ট বিড়ালছানা ‘পিশু’কেও জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু উত্তর দেয় না বলে গোমরা মুখে ফিরে আসে। ফাহিমের এই কাণ্ডকারখানা দেখে ওর মা হেসে কুটিকুটি। ভুলে যান নিজের শত দুঃখ-কষ্ট। ফাহিম এখন সাইকেল চালিয়ে নিয়মিত স্কুলে যায়। মন দিয়ে পড়াশোনা করে। আর মায়ের জন্য মন ভরে দোয়া করে- যেন আল্লøাহ ওর আম্মুকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখেন; যাতে এভাবেই তিনি ওর ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে পারেন। ফাহিম খুব ভালোবাসে তার আম্মুকে। মনে মনে বলে, ইশ! পৃথিবীর সব মায়েরাই যদি ওর আম্মুর মতো এত্ত ভালো হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো! ফাহিমের কাছে আম্মুই ওর পৃথিবী। ওর সব কিছুকে ঘিরেই আম্মু। কারণ এই পৃথিবীতে আম্মু ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ নেই তার। দূর সম্পর্কের এক আঙ্কেল আছে শুধু, যিনি বাবা বেঁচে থাকতে মাঝে মধ্যে আসতেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর দু-একবারও এদিকে ঢুঁ মেরেছেন কিনা ওর জানা নেই। তাই আম্মুই ওর সব। প্রাণ ভরে ভালোবাসেন তাকে। কিন্তু তবুও মাঝে মধ্যে ওর দুষ্টুমির কারণে আম্মু কষ্ট পান, আবার হাসিমুখে সব ভুলেও যান। কাছে টেনে নেন। আদর করেন। ভালোবাসেন। চুলে বিলি কাটেন আর বলেন- ফাহিম সোনা! তুমি খুব মন দিয়ে পড়বে, অনেক বড় হবে জীবনে, ঠিক আছে? ফাহিম শিশু মনে উত্তর দেয়- ‘আম্মু! তুমি যদি পাশে থাকো তাহলে, আমি হিমালয়কেও জয় করতে পারব; জীবনে বড় হওয়া এ আর কী এমন কঠিন কাজ। আর তুমি যদি পাশে না থাকো তাহলে, এই পৃথিবীতে আমি এক মুহূর্ত বাঁচব না।’ রাহেলা বানু ওর কথা শুনে হাসেন। অবাক হন। আবার ফাহিমের চুলের বিলে কাটাতেই হারিয়ে যান। এভাবেই দিন যায়, রাত আসে। রাত কেটে ভোর। ফাহিম ও রাহেলা বানুর ছোট্ট সংসার সুখেই কাটছিল। ফাহিম রোজ সকাল ৮টায় স্কুলে যায় বিকেল ৪টায় ফিরে আসে। ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে ঘুমায় নয়তো মায়ের অপেক্ষায় বসে থাকে। রাহেলা বানু অফিস থেকে ফিরেন সন্ধ্যা ৬টায়। আসার সময় ফাহিমের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসেন, কখনো বাদাম তো কখনো চকলেট। তাই ফাহিম, অধীর অপেক্ষায় মায়ের পথ চেয়ে বসে থাকে। এভাবেই কাটছিল সুখময় দিনগুলো।
আজ বুধবার। স্কুলে আসার পর থেকেই কেন জানি একটুও ভালো লাগছিল না ফাহিমের। মনের মধ্যে খচখচ করছিল, আর বারবার মায়ের কথা মনে পড়ছিল। এভাবে মন খারাপ করেই স্কুলের সময়টা কেটে গেল। বিকেল ৪টা। স্কুল ছুটি হলো। ফাহিম বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে না খেয়েই বসে রইল। আম্মুর অপেক্ষায়। আম্মু আসলে একসাথে খাবে। সময় গড়িয়ে চলে, গড়াতেই থাকে। ফাহিম ঘড়ির দিকে তাকায় ‘৭টা’ বাজতে চলল। কিন্তু আম্মু আজ এখনো আসছে না কেন? কখনো তো এত দেরি করেন না! সন্ধ্যা কেটে রাত হলো। বেড়েই চলল রাত। কিন্তু আম্মুর দেখা নেই কোথাও। ফাহিম আশপাশের বাড়িগুলোতেও খোঁজ নিয়েছে, তারা আম্মুকে দেখেনি। নানা দুশ্চিন্তায় ফাহিমের শিশুমনটা কেঁদে উঠল। আচ্ছা! গলির ওই কুকুরগুলো কি আম্মুকে খেয়ে ফেলেছে? নাহ, ওরা খাবে না। সেদিন পাশের বাসার আঙ্কেল ওদের খুব বকেছে। মেরেছে। ওরা খাবে না। তাহলে আম্মু গেল কোথায়? এভাবেই অজানা ভয় আর কেঁদে কেটেই রাত্রি শেষ হলো। সারারাত ঘুমোতে পারেনি ফাহিম। শেষ রাত্রে একটু ঘুমিয়েছিল। কিন্তু ঘরের সামনে কাদের যেন শোরগোল। ঘুম ভেঙে গেল ফাহিমের। দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই দেখে, উঠোনে কাকে যেন শুয়ে রাখা হয়েছে। সাদা চাদরে ঢাকা পুরো শরীর। পাশে দাঁড়ানো ওর সেই আঙ্কেল ও প্রতিবেশীরা। কাছে যেতেই আঙ্কেল বলল- ফাহিম! কাল সন্ধ্যায় তোমার মা অফিস থেকে ফেরার সময় ট্রাক অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু বাঁচানো যায়নি। কথাগুলো ফাহিমের বিশ্বাস হয় না। সামনে এগিয়ে গেল। চাদর সরাতেই দেখে ওর আম্মু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কপালের মাঝখানটা সেলাই করা। চেহারা কেমন ফ্যাকাশে। ফাহিম সেলাইকৃত সেই কপালেই চুমু এঁকে দেয়। অজানা এক শূন্যতায় ওর বুকটা হাহাকার করছে। ভালো লাগছে না কিছু। মাথাটা ভনভন করছে। কেন জানি এই অসময়ে ওর খুব ঘুম পাচ্ছে। তাই মায়ের কোলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে ফাহিম। যে ঘুমে কখনো কেউ জাগাতে পারে না, সেই ঘুম। আঙ্কেল ও প্রতিবেশী লোকেরা ডাকতে থাকে- ফাহিম! ফাহিম!
কিন্তু ফাহিম ওঠে না। জাগে না। আজ কোনো ডাকই ওকে জাগাতে পারবে না। ও যে ঘুমিয়েছে ওর মমতাময়ী মায়ের কোলে।
তবুও সবাই ডাকছে- ফাহিম! ফাহিম!



