পাথরশূন্য ‘সাদা পাথর’, প্রশাসন নির্বিকার

এক বছরে কী পরিমাণ পাথর লুট হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান প্রশাসনের কাছে নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, সিলেটের পাথর কোয়ারি ও কোয়ারিভুক্ত এলাকা ছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে অন্তত দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে।

সিলেট ব্যুরো
Printed Edition
পাথরশূন্য ‘সাদা পাথর’, প্রশাসন নির্বিকার
পাথরশূন্য ‘সাদা পাথর’, প্রশাসন নির্বিকার

লাগামহীন লুটপাটে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়েছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর। প্রশাসনের নিরবতায় ও কতিপয় রাজনৈতিক নেতার মদদে দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত পর্যটনকেন্দ্র ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গত কয়েক মাস ধরে প্রভাবশালী চক্রের অবাধ পাথর লুটের ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে সাদাপাথর এখন মরুভূমির পথে।

শুধু তাই নয়, এই চক্রটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফাঁড়ি এলাকা মাড়িয়ে জিরো পয়েন্ট দিয়েও লুট করছে পাথর। এতে বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি।

তবে গত এক বছরে কী পরিমাণ পাথর লুট হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান প্রশাসনের কাছে নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, সিলেটের পাথর কোয়ারি ও কোয়ারিভুক্ত এলাকা ছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে অন্তত দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। এভাবে লুটপাট অব্যাহত থাকলে সিলেট পাথরশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ দিকে পাথর লুটের ঘটনায় জরুরি পর্যালোচনা আহ্বান করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মো: মাহবুব মুরাদ। আজ বুধবার এ সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে দৈনিক নয়া দিগন্তকে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বেলাসহ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন পাথর কোয়ারি পরিবেশ ও প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে এসব স্থান থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে সরকার। এর পর থেকে কাগজ কলমে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবের চিত্র ছিল উল্টো। তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পাথর উত্তোলন করতেন। সেই সময় মাঝে মাঝে নামকাওয়াস্তে অভিযান হলেও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

গত বছরের ৫ আগস্টের পরে সিলেটের সাদাপাথর লুটপাট হয়েছে সবচেয়ে বেশি। টাস্কফোর্সের অভিযান ও পাথর খেকোদের লুকোচুরি যেন নিত্যদিনের চিত্র। পাথরকাণ্ডে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে বেশ কয়েকজন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী বহিষ্কৃৃত হন। মামলার আসামি এবং কারাগারেও গিয়েছেন বিএনপির কেউ কেউ। এরপরও থেমে থাকেনি পাথর লুটপাট। সর্বশেষ গত সোমবার (১১ আগস্ট) পাথর লুটপাটে জড়িত থাকায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সভাপতির পদ স্থগিত করেছে বিএনপি।

স্থানীয়রা জানান, দিনরাত সমানতালে হাজার হাজার শ্রমিক কোদাল, বেলচা, শাবল আর টুকরি নিয়ে কোয়ারি ও এর আশপাশের এলাকায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে পাথর বের করেন। হাজার হাজার বারকি নৌকায় সেসব পাথর বহন করে এনে মিলমালিকদের কাছে বিক্রি করেন তারা। পরে সেসব পাথর মেশিনে ভেঙে ছোট করে ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ওই ব্যবসায়ীরা ট্রাক ও পিকআপে পাথর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান।

জানা গেছে, স

ম্প্রতি পাহাড়ি ঢলের সাথে ধলাই নদের উৎসমুখে বিপুল পরিমাণ পাথর আসে। প্রকাশ্যেই সেই সব পাথর নৌকা করে নিয়ে লুট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত নৌকা দিয়ে লুটের পাথর পরিবহন করা হচ্ছে। নদী তীরের বালু ও মাটি খুঁড়েও চলছে লুট। ব্যাপক লুটপাটের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এ এলাকাটি একেবারে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের সামনেই দিনদুপুরে চলছে লুটপাট। আর এসবের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এতে দুয়েক দিনের জন্য পাথর উত্তোলন বন্ধও থাকে। তবে ফের সেই পুরনো দৃশ্যের অবতারণা হয় সাদাপাথরে।

স্থানীয় এক সংবাদকর্মী জানান, গত দুই সপ্তাহে সাদা পাথর এলাকায় কয়েক দফা পাহাড়ি ঢল নামে। প্রতিবারই ঢলের তোড়ে স্তরে স্তরে পাথর ও বালু নামে। এবার দফায় দফায় ঢলের পর শুধু বালু দেখা গেছে। বালুর স্তর সরিয়ে পাথর লুটপাট হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, দুই সপ্তাহে অন্তত শত কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে।

সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সাদাপাথরে সরাসরি পুলিশের টহল দেয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের মাহমুদ আদনান। তিনি বলেন, এলাকাটি বিজিবি নিয়ন্ত্রিত। যার কারণে সেখানে সরাসরি পুলিশের টহল দেয়ার সুযোগ নেই। এরপরও যতবারই টাস্কফোর্সের অভিযান হচ্ছে আমরা সেখানে তাদের সহযোগিতা করেছি। এমনকি আমরা এরই মধ্যে লুটের ঘটনায় প্রায় ১৭টি মামলা নিয়েছি। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৭০ জনকে। এ ছাড়া টাস্কফোর্সের অভিযানে প্রচুর জেল-জরিমানাও করা হয়েছে।

জানা গেছে, সাদাপাথর এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। সেখানকার ঝরনা থেকে সারা বছর নদের পানি প্রবহমান থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সাথে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ভেসে আসা এই পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি। এটির কদরও বেশি। ব্যবহৃত হয় স্থাপত্যকাজে।

সাদাপাথর এলাকাটির অবস্থান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে। ২০১৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের চেষ্টায় সেসব পাথর সংরক্ষিত হয়েছিল। তখনকার জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার ও ইউএনও আবুল লাইছ নিজ উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর উপজেলা প্রশাসন সংরক্ষণের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সর্বশেষ সুমন আচার্য ইউএনও থাকাকালে সাদা পাথর নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেন। সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এলাকাটি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো: রেজা-উন-নবী বলেন, সাদাপাথর পর্যটন স্পট খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের টিম ইতোমধ্যে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছে। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা পুলিশ, বিজিবির সমন্বয়ে অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সাদাপাথর লুটপাটের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাদাপাথরের বিষয়টি নিয়ে বুধবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন।

এ ব্যাপারে সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, সাদাপাথর এলাকায় পুলিশের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা আছে। কিন্তু ওই জায়গায় ২৪ ঘণ্টা বসিয়ে রাখার মতো জনবল আমাদের নেই।

অবশেষে পদ হারালেন বিএনপির সভাপতি : অবশেষে সিলেটের জনপ্রিয় ও দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট সাদা পাথরের আসল ও মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য পাথর লুটপাটের সাথে জড়িত কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের পদ স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। কিছুদিন আগে জেলা বিএনপি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। জবাবও দিয়েছিলেন অভিযুক্ত সাহাব উদ্দিন। কিন্তু তা মনঃপূত হয়নি জেলা নেতাদের।

বিএনপির জেলা সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ বিষয়টি পরে কেন্দ্রকে অবহিত করেন। সোমবার (১১ আগস্ট) রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে পাঠানো চিঠিতে সাহাব উদ্দিনের সভাপতি পদ স্থগিত করার বিষয়টি জানানো হয়।