শরিফুজ্জামান লোহাগড়া (নড়াইল)
একসময় গ্রামবাংলার বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে ও ঝোপঝাড়ে সহজেই দেখা মিলত করমচা গাছের। বর্ষা মৌসুমে টক স্বাদের লালচে এ ফল ছিল শিশু-কিশোরদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, বনজঙ্গল উজাড় এবং বসতবাড়ি সম্প্রসারণের কারণে এখন পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই দেশীয় ফলের দেখা মিলছে অনেক কম।
করমচা (বৈজ্ঞানিক নাম ঈধৎরংংধ পধৎধহফধং) বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলের সমতল ভূমিতে জন্মে। কাঁটাযুক্ত গুল্মজাতীয় এ উদ্ভিদ খরা সহনশীল এবং তুলনামূলক কম পরিচর্যাতেই বেড়ে ওঠে। সাধারণত ফেব্রুয়ারিতে গাছে ফুল আসে, এপ্রিল-মে মাসে ফল ধরে এবং বর্ষাকালে ফল পাকতে শুরু করে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ হলেও পরিপক্ব ফল গাঢ় লাল বা ম্যাজেন্টা রঙ ধারণ করে।
শুধু স্বাদ নয়, করমচা পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়ামসহ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এ কারণে ফলটি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যকর দেশীয় ফল হিসেবে পরিচিত।
লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: আবুল হাসনাত পিন্টু বলেন, করমচা শরীরের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ হওয়ায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে, দাঁত ও মাড়ির সুস্থতা বজায় রাখতে এবং মৌসুমি সর্দি-জ্বরে উপকারী হতে পারে। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও পরিমিত পরিমাণে এ ফল খেতে পারেন।
করমচা শুধু ফল হিসেবেই নয়, সৌন্দর্যবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবেও জনপ্রিয়। কাঁটাযুক্ত সবুজ গাছ, সাদা ফুল এবং টকটকে লাল ফলের কারণে অনেকেই বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা বারান্দায় শখের বশে এ গাছ লাগান।
লোহাগড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুনমুন সাহা জানান, উপজেলায় করমচা গাছের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও কৃষি বিভাগ দেশীয় ফলের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে কাজ করছে। কৃষকদের বাণিজ্যিকভাবে করমচা চাষে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চারা বিতরণ করা হচ্ছে।
কৃষিবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাবে অনেক দেশীয় ফলের মতো করমচার সংখ্যাও কমছে। তাই বসতবাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পতিত জমিতে করমচাসহ দেশীয় ফলের গাছ রোপণ বাড়ানো গেলে একদিকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ফিরে আসবে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ঐতিহ্যবাহী ফল।



