বাদামতলীতে ফলের গাড়িতে চতুর্মুখী চাঁদাবাজি

পুরান ঢাকার বাদামতলীতে ফলের গাড়ি ঘিরে চলে চতুর্মুখী চাঁদাবাজি। ফল ভর্তি গাড়ি থামিয়ে স্পট অনুযায়ী ১০ থেকে ৮ হাজার টাকা চাঁদা নেয়া হচ্ছে। আর খালি গাড়ি পনের শ’ থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা। সব মিলিয়ে দৈনিক সাড়ে তিন থেকে ৪ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক ও থানা পুলিশ ছাড়াও সরকার দলীয় পরিচয়ে কিছু অসাধু নেতা এ টাকার ভাগ নিচ্ছে।

Printed Edition

শামীম হাওলাদার

  • প্রতিদিন ৪ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়
  • ফ্যাসিস্ট চেয়ারম্যান নেয় অর্ধেক

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাদামতলীতে ফলের গাড়ি ঘিরে চলে চতুর্মুখী চাঁদাবাজি। ফল ভর্তি গাড়ি থামিয়ে স্পট অনুযায়ী ১০ থেকে ৮ হাজার টাকা চাঁদা নেয়া হচ্ছে। আর খালি গাড়ি পনের শ’ থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা। সব মিলিয়ে দৈনিক সাড়ে তিন থেকে ৪ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক ও থানা পুলিশ ছাড়াও সরকার দলীয় পরিচয়ে কিছু অসাধু নেতা এ টাকার ভাগ নিচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম ফল মার্কেট রাজধানীর কোতোয়ালি থানা এলাকার বাদামতলী। রমজানে প্রতিদিন তিন থেকে চার শ’ ফলের ট্রাক ও লরি নিয়মিত বাদামতলীতে আসছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজরা দেদার তুলছে চাঁদা। পুলিশ ও সরকার দলীয় লোক ছাড়াও হিজড়ারাও তুলছে চাঁদা। এ ছাড়া বাদামতলী ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি পরিচয়দানকারী আওয়ামী লীগ নেতা ও মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার বজ্র যোগিনী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সিরাজ হাজীর নেতৃত্বে প্রতিদিন কমপক্ষে ২ কোটি তোলা হয়।

সূত্র জানায়, বাদামতলীতে ফলের গাড়ি ঢুকতে চার স্পটে চাঁদাবাজি হয়। তা হলো- কাগজ মার্কেটের সামনে, গ্লাস মার্কেটের সামনে, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গের কর্নারে। এ ছাড়াও চাঁদা নেয়া হয় বাদামতলীর নানান স্পটগুলোতে।

বাদামতলী : বিআইডব্লিউটিসি ভবনের সামনে থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত ফল ভর্তি ট্রাক ও লরী সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। ফল ভর্তি এসব গাড়ি থেকে ৬০০০ টাকা করে চারশত গাড়ি থেকে থেকে মোট ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সমিতির নামেও নেয়া হয় ৭০০ টাকা করে ৪০০ গাড়ি থেকে মোট ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এমনকি লাইনম্যানের নামেও নেয়া হয় ৫০ টাকা করে ২০ হাজার টাকা। চাঁদাবাজির এসব টাকা সব নিচ্ছেন ফল মার্কেটের সভাপতি সিরাজ হাজী। যদিও ২০১৮ সালে এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তারপরেও জোরপূর্বক সিরাজ হাজী সমিতির সভাপতি ঘোষণা দিয়ে এ চাঁদাবাজি দিব্যি করে যাচ্ছেন। ৫ আগস্টের পরে সিরাজ হাজীকে ছাত্র হত্যার মামলায় ধরে নিয়ে যায় কোতোয়ালি থানা পুলিশ। ওই সময়ে ৬০ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পান সিরাজ হাজী। এ ছাড়া ফল ব্যবসায়ী মেঘলা এন্টাপ্রাইজের মালিক মামুন গত বছরের ৩ জুন লিভারজনিত রোগে মারা যান। পরে আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজ হাজীর নেতৃত্বে ১৮/১ শাহজাদা লেনের গোডাউনে থাকা ২ কোটি টাকার খেজুর, মার্কেটে পাওনা ৭০ লাখ টাকা ও ব্যাংকে থাকা এক কোটি টাকা মামুনের স্ত্রীকে নিয়ে আত্মসাৎ করেন সিরাজ হাজী। এ নিয়ে নয়া দিগন্তে নিউজ প্রকাশের পরে মামুনের ভাইকে আমতলী এলাকা থেকে বিতাড়িত করেন সিরাজ হাজী। একাধিক ফলব্যবসায়ী জানান, বাদামতলীতে দুইজন ডন একজন করিম হাজী অন্যজন সিরাজ হাজী। এখানে দলীয় লোকের কোনো সযোগ নেই। গণ-অভ্যুত্থানের পরে করিম হাজী আত্মগোপনে গেলেও সিরাজ হাজী প্রকাশ্যে রয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আত্মীয় ও বিএনপি নেতাদের সহযোগিতায় তিনি এখন একক হিরো বাদামতলীর। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজ হাজী জানান, ফোনে কোনো কথা বলতে রাজি নন তিনি, বলেন বাদামতলীতে আসেন কথা হবে এ বলে ফোন কেটে দেন তিনি।

হাজী সেলিমের জেটি : বাদামতলীর সামনে বুড়িগঙ্গায় জেটি নির্মাণ করেন হাজী সেলিম ফলের গাড়ি রাখতে। আগে বিআইডব্লিউটিএকে কোনো পাত্তা দিতেন না হাজী সেলিম। পরে বিআইডব্লিউটিএ থেকে এ জেটি ইজার নেয় ফ্যাসিস্ট করিম হাজী। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পরে নিয়ন্ত্রণে নেয় যুবদল নেতা জুয়েল ও তার বাহিনী। প্রতিদিন জেটিতে রাখা প্রতিটি ফলের গাড়ি থেকে ৮ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলে ফারুক ও সোবহান নামে দুই ব্যক্তি। দৈনিক তিন থেকে চার লাখ টাকা চাঁদা তোলে তারা। এ বিষয়ে জুয়েলের সাথে কথা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, করিম হাজীর কাছ থেকে লিখিত নিয়েছেন তিনি। তাই কোনো চাঁদাবাজি হচ্ছে না। তিনি এও বলেন, তার পাশে নাকি আইজিপি বসে থাকেন।

বাবুবাজার ব্রিজের নিচে ও মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গের কর্নার : বাদামতলী ফল মার্কেটে ঢোকার মুখ। এ মুখের চারপাশে অর্থাৎ ব্রিজের নিচে ও সাইডে ফলের গাড়ি রাখতে বাধ্য করেন রিচার্ড নামে এক যুবদল নেতা। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি ট্রাক কিংবা লরি আটকিয়ে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা নিচ্ছে এই রিচার্ড। এখান থেকে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশও চাঁদাবাজি করে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের দিকে ট্রাফিক পুলিশকে চাঁদা তুলতে দেখা গেছে। পরে টিআইকে বিষয়টি জানালে চাঁদার বিষয়টি স্বীকার করেছেন টিআই বিদ্যুৎ।

কাগজ মার্কেটের সামনে : বাবুবাজার ব্রিজের পাশ দিয়ে ঢুকতেই কাগজ মার্কেটের সামনে কোতোয়ালি থানার পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতার নামে ফলের গাড়ি থেকে গাড়িপ্রতি ৫০০ টাকা করে দৈনিক ২০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়।

গ্লাস মার্কেট : এখানে খালি ফলের ট্রাক ও লরি রাখা হয়। ট্রাকপ্রতি ১৫০০ টাকা এবং লড়িপ্রতি ২০০০ টাকা নেয়া হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতারা এ চাঁদাবাজির সাথে জড়িত বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ডিএমপি কোতোয়ালি থানার ওসি শাহ মোহাম্মদ ফয়সাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বাদামতলীতে কোনো চাঁদাবাজের স্থান নেই। চাঁদাবাজ যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে। এতে যদি কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ দিকে রাস্তার ওপরে অবৈধভাবে বিভিন্ন ট্রাক ও লরি আটকে চাঁদাবাজির বিষয়ে টিআই বিদ্যুৎ নয়া দিগন্তকে বলেন, কোন গাড়ি ধরলেই স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা তাদের দলবল নিয়ে ট্রাফিক বক্সে এসে হুমকি দিচ্ছে। যদি তাদের কথা না শুনি তাহলে অপমান অপদস্থ ছাড়াও দূরে কোথাও বদলি করে দিবে বলে হুমকি দেয়। তাই এখানে কাজ করতে ভয় পাচ্ছি।

এ বিষয়ে ডিএমপি লালবাগ ডিভিশনের ট্রাফিক ডিসি ও লালবাগ ডিভিশনের ক্রাইম ডিসিকে বারবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি তারা।