- ৩ বছর থেকে গড়াল সাড়ে ৯ বছরে
- সমাপ্তির মুখে টাকার সঙ্কট
গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। অতীত সরকারের আমলে নেয়া প্রকল্পগুলো তখন যেমন দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে চলছিল, এখনো সেগুলো একই তালে চলছে। তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল, পার হয়ে গেছে প্রায় ৯টি বছর। খরচও বেড়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। তবু পুরোপুরি শেষ হয়নি। এটি চট্টগ্রামের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প। সরকারি নথি বলছে, এ প্রকল্পের ভৌত কাজ শেষ হয়েছে ৯৪ শতাংশ। বাকি মাত্র ছয় শতাংশ। আর সেই শেষ ছয় শতাংশই এখন প্রকল্পটির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কাজ শেষ করতে প্রয়োজন আরো ২৬৩ কোটি টাকা। সরকারি নথি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্প দলিলের তথ্যে জানা গেছে, চট্টগ্রামের যানজট কমানো এবং শহরের সাথে বিমানবন্দরের দ্রুত যোগাযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২০ মিনিটে শাহ আমানত বিমানবন্দরে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। একই সাথে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য নতুন সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সিইপিজেড ও কেইপিজেডের সাথেও সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের সাথে সংযোগের মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ আরো সহজ হওয়ার কথা।
তিন বছর থেকে গড়াল সাড়ে ৯ বছরে : গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের আমদানি রফতানি বাণিজ্য বেশির ভাগই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে এ শহরে ৪৫ লক্ষাধিক লোক বসবাস করছে। প্রতি বছর প্রায় এক লাখ জনসংখ্যা নতুন করে যোগ হচ্ছে। ক্রমর্বধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মহানগরীতে দিন দিন যানজট তীব্র হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ জংশনগুলোতেও যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের এ ধরনের সমস্যা সমাধান এবং আন্তর্জাতিক মানের শহররূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম শহরে লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মূল অনুমোদন হয়েছিল ২০১৭ সালের ১১ জুলাই। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন- অর্থাৎ তিন বছর। কিন্তু সেই সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটি পরে সংশোধন করা হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ৩১৪ কোটি ৮৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি ৩২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। প্রকল্পটি এ পর্যন্ত দুইবার সংশোধিত হয়েছে। সময়ও বাড়ানো হয়েছে চারবার। সর্বশেষ সংশোধনে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে কাজ তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন প্রায় এক দশক ধরে চলছে। ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করতে বর্তমান বরাদ্দের চেয়ে আরো ২৬২ কোটি ৭১ লাখ ছয় হাজার টাকা প্রয়োজন। সেই অর্থ অন্য একটি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে উপযোজন করে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, মূল নির্মাণ প্যাকেজের দ্বিতীয় ভেরিয়েশনে প্রায় ১৬৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাবও এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় বলে সরকারি নথির তথ্য থেকে জানা গেছে।
সমাপ্তির মুখে টাকার সঙ্কট : মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি জুন পর্যন্ত ৯ বছরে ৯৪ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৯১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুন ২০২৬ পর্যন্ত জিওবি খাতে ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৯৪৬ কোটি ৫৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা। কিন্তু কাজের শেষ ধাপের জন্যই এখন প্রয়োজন বাড়তি অর্থ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২১ কোটি ৯৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। অথচ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশিষ্ট ভৌত কাজ শেষ করতে প্রয়োজন ২৮৪ কোটি ৬৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২৬২ কোটি ৭১ লাখ ছয় হাজার টাকা। এই অর্থ চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে উপযোজন করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায়। নথিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দ্রুত অনুমোদন করে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করা না হলে ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করা কঠিন হবে।
টাকা ছিল, খরচ হলো না কেন : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবেও উঠে এসেছে অর্থ ব্যবস্থাপনার সমস্যা। ওই অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটির জন্য চার শ’ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ডব্লিউডি-১ প্যাকেজের দ্বিতীয় ভেরিয়েশন প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় পুরো অর্থ খরচ করা যায়নি। বরাদ্দ থেকে ১২০ কোটি টাকা অন্য একটি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে উপযোজন করা হয়। বাকি ২৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার মধ্যে ২৮০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা অবমুক্ত করা হলেও খরচ করা সম্ভব হয় ১০৩ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ফলে অব্যয়িত ১৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা ফেরত দেয়া হয়। অর্থাৎ বরাদ্দ ছিল, অর্থও অবমুক্ত হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো কাজের অগ্রগতি না থাকায় সেই অর্থের বড় অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
এক ভেরিয়েশন, চার দফা কমিটি : প্রকল্পের ডব্লিউডি-১ প্যাকেজের দ্বিতীয় ভেরিয়েশন নিয়েও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে সরকারি নথিতে। ২০২৫ সালের ২২ মে দ্বিতীয় ভেরিয়েশন প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তারপর প্রস্তাবটি পরীক্ষা করতে প্রথমে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়। সেই প্রতিবেদনের যথার্থতা যাচাই করতে গঠিত হয় তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি। এরপর আরো পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানেই শেষ হয়নি বিষয়টি।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরে চউকের নতুন কর্মকর্তাদের নিয়ে আরো পাঁচ সদস্যের ভেরিয়েশন যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রস্তাবিত ভেরিয়েশনকে প্রচলিত আইন ও প্রক্রিয়া মেনে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে মত দেয়। অর্থাৎ একটি ভেরিয়েশন প্রস্তাব নিয়ে দফায় দফায় তদন্ত, যাচাই এবং আবার যাচাই হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষে ডব্লিউডি-১ প্যাকেজের দ্বিতীয় ভেরিয়েশনে ১৬৩ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার ৪০১ টাকা ৬৮ পয়সা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। চউকের ৪৬৯তম বোর্ডসভায় বিষয়টি আলোচনার পর প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানোর ক্ষেত্রে আপত্তি নেই বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সংশোধিত দ্বিতীয় ভেরিয়েশন প্রস্তাবের মোট পরিমাণ তিন হাজার ৫৩৩ কোটি ছয় লাখ ৪১ হাজার ২৫২ টাকা ৯৭ পয়সা। প্রস্তাবটি ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে যখন হাতে কয়েক মাস, তখনো গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজের ভেরিয়েশন ঝুলে রয়েছে।
র্যাম্পেই আটকে শেষ সংযোগ : মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার তথ্য বলছে, মূল এলিভেটেড অংশের বড় অংশ শেষ হলেও বিভিন্ন র্যাম্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। টাইগারপাসের আমবাগানমুখী ডাউনওয়ার্ড র্যাম্প, নিমতলার ডাউনওয়ার্ড ও আপওয়ার্ড র্যাম্প এবং ফকিরহাট ডাউনওয়ার্ড র্যাম্পের কাজ ১০০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু সিইপিজেডের ডাউনওয়ার্ড র্যাম্পের কাজ ৯৯ শতাংশ, জিইসি মোড়ের ওয়াসামুখী আপওয়ার্ড র্যাম্প ৯৪ শতাংশ, সিইপিজেড আপওয়ার্ড র্যাম্প ৯২ শতাংশ এবং কেইপিজেডের লালখান বাজারমুখী আপওয়ার্ড র্যাম্প ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। সবচেয়ে পিছিয়ে আগ্রাবাদ ডেবারপাড় থেকে সি-বিচমুখী আপওয়ার্ড র্যাম্প। এর অগ্রগতি মাত্র ৫২ শতাংশ। জায়গা পুরোপুরি বুঝিয়ে দিতে না পারায় কয়েকটি র্যাম্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়নি বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পে ৫৬টি অডিট আপত্তি : প্রকল্প নথির তথ্য বলছে, প্রকল্পটির বিরুদ্ধে ২৯টি অভ্যন্তরীণ অডিট আপত্তি এবং ২৭টি পূর্ত অডিট আপত্তি রয়েছে। মোট আপত্তির সংখ্যা ৫৬টি। এসব আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য অডিট কমিটির ত্রিপক্ষীয় সভা দ্রুত আয়োজনের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের শেষ ধাপে শুধু নির্মাণকাজ শেষ করাই নয়, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তিও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের মত : প্রকল্পের ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ। কিন্তু অবশিষ্ট ছয় শতাংশের মধ্যেই রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ র্যাম্প, অর্থের ঘাটতি এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের অপেক্ষা। তার সাথে রয়েছে ৫৬টি অডিট আপত্তি। প্রশ্ন তাই একটাই- চার হাজার ৩১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প কি সত্যিই ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পুরোপুরি শেষ হবে? প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সামনে এখন তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে- অতিরিক্ত ২৬২ কোটি ৭১ লাখ ছয় হাজার টাকা দ্রুত বরাদ্দ, ডব্লিউডি-১ প্যাকেজের দ্বিতীয় ভেরিয়েশনের অনুমোদন এবং অডিট আপত্তিগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি। এই কাজ সময়মতো হলে হয়তো তিন বছরের প্রকল্পটি দেরিতে হলেও সাড়ে ৯ বছরের অপেক্ষার অবসান হবে। তবে এখনো এই মেগা প্রকল্পটি নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে।



