তিন দিনেও গ্রেফতার হয়নি সিলেটের সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা, আতঙ্ক নগরজুড়ে

ভয়ঙ্কর এই ছিনতাইয়ের ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল

Printed Edition

আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট

সিলেট নগরীর অভিজাত এলাকা হাউজিং এস্টেটে দিনদুপুরে ফিল্মি স্টাইলে ছিনতাইয়ের তিনদিন পরও ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভয়ঙ্কর এই ছিনতাইকারীরা অধরা থাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে নগরজুড়ে। সিলেটে এমন স্টাইলে ছিনতাই নিকট অতীতে আর দেখা যায়নি।

জানা গেছে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বেলা ২টার দিকে হাউজিং এস্টেট এলাকার সড়কে রেজিস্ট্রেশন নম্বরবিহীন তিনটি মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরিহিত ছয়জনের সশস্ত্র ছিনতাইকারী দল একটি সিএনজি অটোরিকশার গতিরোধ করে। তারা অস্ত্র উঁচিয়ে এক নারী যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার ভিডিও দ্রুত সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উদ্বেগ দেখা দেয় সিলেটজুড়ে।

এ দিকে আলোচিত এই ছিনতাইয়ের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশের এমন ভূমিকায় রহস্যের জাল দেখছেন নগরবাসী। রাজনৈতিক কারণে তারা নীরব ভূমিকা পালন করছে বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তবে পুলিশ বলছে, ছিনতাইকারীদের পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ করছে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ। দ্রুত তাদেরকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন এসএমপির এয়ারপোর্ট থানার ওসি মোবাশ্বের হোসেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে। এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। ছিনতাইকারীরা শনাক্ত হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে। অভিজাত নির্জন হাউজিং এস্টেট এলাকা ছিনতাইকারীদের যেন নিরাপদ টার্গেট। এর আগে ১২ জানুয়ারি সকালে একই এলাকার ৮ নম্বর লেনে রিকশা থামিয়ে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর ব্যাগ ছিনতাই করা হয়। ভুক্তভোগী ওই নারী পশ্চিম পীর মহল্লার বাসিন্দা এবং নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত। কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন। তার ব্যাগে একটি মোবাইল ফোন, নগদ ৮ হাজার ৭০০ টাকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর ভাই নয়ন মিয়া সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তবে প্রায় দেড় মাস পার হলেও এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। নয়ন মিয়া বলেন, ‘প্রথমে ব্যাগ নিতে না পেরে ছুরি বের করে আমার বোনকে হত্যার হুমকি দেয় ছিনতাইকারী। সে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় কোনো প্রতিরোধ করতে পারেনি।’

ভুক্তভোগীরা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা হেলমেট ও মাস্ক পরে নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলে আসে। রিকশা বা সিএনজির গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অথবা আঘাত করে মূল্যবান সামগ্রী লুট করে দ্রুত পালিয়ে যায়।

সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও একই এলাকার বাসিন্দা সাবেক কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ঘটনা রহস্যজনক। ব্যাংকের সামনে ওঁৎপেতে থাকে ছিনতাইকারীদের একটি চক্র। কোনো গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বের হলে দ্রুত ছিনতাইকারী চক্র খবর পেয়ে যায়। তাদের প্রধান টার্গেট নারী যাত্রীরা। তিনি জানান, ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে যাচাই-বাছাই করা হলেও এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। এমনকি ওই ছিনতাইকারীরা কেউ পুলিশের তালিকায় পুরনো অপরাধী নয়। ছিনতাইকারীদের শনাক্তে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

ভয়ঙ্কর এই ছিনতাইয়ের ভিডিও ভাইরাল : ছিনতাইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়ের ভিডিও নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। ভিডিও থেকে নেয়া ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে সাইবার জগতে। মুখমণ্ডল, শারীরিক গঠন ও মোটরসাইকেলের ধরনও বুঝা যাচ্ছে। এরপরেও ছিনতাইকারীদের ধরতে পুলিশের ঘাম ঝরছে।

মঙ্গলবারের (২৪ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশ্যে দিনদুপুরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা যাত্রী ইয়াসমিন আক্তারের কাছ থেকে ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার সাথে জড়িত ছিনতাইকারী গ্রুপের আতঙ্কের কথা এখন নগরবাসীর মুখে মুখে। শুধু এ ঘটনাই নয়, এভাবে প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে এই নগরীতে। কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও অধিকাংশ থানা পুলিশের ভয়ে থেকে যায় আড়ালে। হাউজিং এস্টেটের ঘটনায় তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশি কার্যক্রম শুধুই ‘তদন্ত আর খতিয়ে’ দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

একটি সূত্র জানায়, হাউজিং এস্টেট এলাকায় যারা ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটিয়েছে তারা একাজে খুবই দক্ষ। তাদের নিজস্ব কিছু লোকজনকে দিয়ে ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি রাখে। গ্রিন সিগন্যাল আসলেই তারা মোটরসাইকেল নিয়ে মাঠে নেমে যায়।

সিলেটে এ পর্যন্ত যতটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে তা মোটরসাইকেল দিয়েই। অধিকাংশ ছিনতাইকারী ভুল নম্বর ব্যবহার করে ছিনতাই করতে মাঠে নামে। হাইজিং এস্টেটের ঘটনায় চৌকস ছিনতাইকারীরা ইয়াসমিন আক্তারের টাকা নিলেও আইফোন ও এটিএম কার্ড একটি রেস্টুরেন্টের সামনে রেখে যায় তারা।

গত বছরের দুটো ঘটনা এখনো আলোচনায় : নগরীর আম্বরখানা সুবিদবাজার এলাকায় গত বছরের দু’টি ছিনতাইর ঘটনা ব্যাপক আলোচিত ছিল। ওই বছরের ৭ জুলাই এয়ারপোর্ট সড়ক থেকে দুই ছিনতাইকারীকে স্থানীয় লোকজন আটক করে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। আটক ছিনতাইকারীরা হচ্ছে, জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জের আব্দুল হকের পুত্র সাইফুল ইসলাম (২৫) ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের গৌরিনগরের জাহাঙ্গীর আলমের পুত্র লিমন আহমদ জয় (২৬)। এর মধ্যে সাইফুল ইসলাম নগরের সেনপাড়া আর লিমন নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় বসবাস করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক প্রাইভেট কারে তুলে এয়ারপোর্টের দিকে নিয়ে চলে যায়। প্রথমে ছিনতাইকারীরা অপহৃত কামালকে হাউজিং এস্টেটের ৮নং লেনে নামিয়ে দেবে বললেও পরবর্তীতে এয়ারপোর্টের দিকে নিয়ে যায় এবং তার সাথে থাকা স্মার্ট ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়।

কামালকে এয়ারপোর্ট হয়ে বাইশটিলার দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রাইভেট কারে থেকে চিৎকার করতে থাকেন তিনি। গ্র্যান্ড সিলেটের সামনে আসার পরে কামাল প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে সাইফুল ও লিমনকে হাতে নাতে আটক করেন।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট থানায় কামাল বাদি হয়ে ৩০ জুলাই মামলা দায়ের করেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিধান দেব জানিয়েছেন, চার ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বর মাসে এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

এর আগে ওই বছরেরই ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় সুবিদবাজার পয়েন্ট থেকে জগন্নাথপুরের ব্যবসায়ী ছালিক আহমদকে ধারালো অস্ত্রের মুখে প্রকাশ্যে জোরপূর্বক একটি সিএনজি অটোরিকশায় অপহরণ করে ফাজিলচিশত গলির ভেতরে নিয়ে যায়। ছালিক অপহরণের বিষয়টি তখন আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি অটোরিকশার চালকরা কেবল তাকিয়ে দেখছিলেন। গলির ভেতরে টানা একঘণ্টা তাকে নির্যাতন করে তার পরিবারের সাথে কথা বলায়। অপহরণকারীরা সাফ বলে দেয়, টাকা না দিলে ছালিককে ছাড়া হবে না। জীবন রক্ষায় ছালিকের স্বজনরা এক ঘণ্টার মধ্যে বিকাশে করে এক লাখ টাকা অপহরণকারীদের দেয়া চারটি নম্বরে পাঠিয়ে রক্ষা পেয়েছিলেন।