- নতুন ইঞ্জিন থেকে শুরু করে পোড়া মবিল চুরি
- ভুয়া ভাউচারে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ
সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। এমন অভিযোগ খোদ বিআরটিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তাদের অভিযোগ রক্ষকরাই ভক্ষক হয়ে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে। এই রক্ষকরূপী ভক্ষকদের অন্যতম মাসুদ তালুকদার। যিনি বিগত সরকারের আশীর্বাদে গত ১০ বছর বিআরটিসির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করে সীমাহীন লুটপাট করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট মাসুদ তালুকদারের বিরুদ্ধে বিআরটিসির জন্য কেনা নতুন বাস-ট্রাক থেকে ইঞ্জিন খুলে বিক্রি করে পুরনো ইঞ্জিন বসানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মবিল, পোড়া মবিল বিক্রি, শ্রমিকদের বেতন কর্তন, ট্রিপ চুরি, তেল চুরি, টায়ার চুরি, ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব টাকা দিয়ে নিজের নামে তেমন কিছুই করেননি এই চতুর কর্মকর্তা। তার সম্পদের বেশির ভাগই স্ত্রী, শ্বশুর ও ছোট ভাইয়ের নামে, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে একাধিক বহুতল ভবন, ঢাকার বাসাবো, ওয়ারী, খিলক্ষেতে স্ত্রীর নামে রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। পূর্বাচলের নিউ সিটি টাউনের ২, ৩, ৯, ১০ ও ১১ নম্বর সেক্টরে সাতটি প্লট।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল করীম সেলিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস-২ গাজি হাফিজুর রহমান লিকুর অবৈধ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুর্নীতির বরপুত্র হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে দুর্নীতির টাকা একাই হজম করেননি। ভাগ দিয়েছেন শেখ সেলিম ও লিকুকেও। নেতাদের হাত মাথায় থাকায় বিগত সময়ে বিআরটিসির প্রতিটি চেয়ারম্যান ছিলেন তার নিয়ন্ত্রণে। মাসুদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত একাধিক অভিযোগ দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে। গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটিও। কিন্তু প্রভাবশালী নেতাদের কারণে বারবারই পার পেয়ে গেছেন তিনি। সবশেষ গত ৩ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের কাছে বিআরটিসির ৯৫ জন সদস্যের স্বাক্ষরসংবলিত একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। যার শুরুতেই বলা হয়েছে প্রকৌশলী মো: মাসুদ তালুকদার ম্যানেজার অপারেশনের শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র। অভিযোগে তারা বলেন, আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের সাথে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছি। এত পরিশ্রমের পরও আমাদের অন্যায়ভাবে শোষিত-বঞ্চিত ও নিপীড়িত করা হচ্ছে। ঠুনকো কারণে বেতন কেটে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই যন্ত্রণা নিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিসহ সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, বর্তমান সরকার নানামুখী চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটিকে টেনে তুলতে। কিন্তু সরষের মধ্যে ভূত থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপক হারে দুর্নীতি করে প্রতিষ্ঠানকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না দুর্নীতিগ্রস্তরা। তারা বলেন, বাজারে গাড়ির একটি হুইল রিমের দাম ১১ হাজার টাকা। কিন্তু মাসুদ তালুকদার তার দাম দেখান ২৭ থেকে ৩০ হাজার টাকা। বেশি দাম দিয়ে নতুন রিম কেনা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটি লাগানো হয় না। পুরনাটাই সংস্কার করে আবার চালানো হয়। নতুনটা চলে যায় দোকানে। কিন্তু সরকারের ৩০ হাজার টাকা চলে যায় মাসুদ তালুকদারের পকেটে। চালকরা লগবইয়ের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ অনুসারে জ্বালানির টাকা পেয়ে থাকেন। কিন্তু মাসুদ তালুকদার তার নিজস্ব লোকদের দিয়ে কিলোমিটার বেশি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করে। ট্রাক আনলোডিংয়ে মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হয়।
১০ মাসে ব্যয় হওয়া টাকার পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি। মূলত কোন পয়েন্টে কত বস্তা মাল আনলোড হয় তার বিপরীতে এই ব্যয় ধরা হয়। এই আনলোডিংয়ের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মাসুদ তালুকদার প্রতি মাসে কোটি টাকার উপরে আত্মসাৎ করে থাকেন। দৈনিক ভাতার নামে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও তা লুটপাট করা হয়ে থাকে। মূলত এই টাকা পাওয়ার কথা চালকদের। কিন্তু একজন চালকও সেই টাকা দেয়া হয় না। একই ভাবে মাইলেস ভাতা নামক একটি খাত থেকেও হাতিয়ে নেয়া হয় কয়েক লাখ টাকা। অভিযোগ করা হয় এভাবে বিভিন্ন খাতের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন মাসুদ তালুকদার। শুধু মাসুদ তালুকদারই নয়, তারমত অনেকেই এখনো বিআরটিসিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করে রেখেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাসুদ তালুকদার সব অভিযোগ অস্বীকার করে নয়া দিগন্তকে বলেন, যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। উল্টো তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সময় তাদের নেতাদের অত্যাচারে ঠিকমতো কাজ করতে পারেননি



